মানুষ গড়ার স্বপ্ন বোনা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সেখানে পাঠ্যবইয়ের অক্ষর জ্ঞান ছাড়াও সততা, শৃঙ্খল্য আর নৈতিকতার পাঠ শেখানো হয়। সেই শিক্ষালয় যদি নিজেই অনিয়মের ভারে রুগ্ন হয়ে পড়ে, তবে সমাজ কোন আয়নায় নিজের ভবিষ্যৎ দেখবে। শিক্ষক নিয়োগের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় যদি জালিয়াতি ও দুর্নীতির ছায়া পড়ে, তবে শিক্ষার্থীরা কাদের কাছ থেকে আদর্শ শিখবে- এসব প্রশ্ন এখন জনমনে।
বাংলাদেশ২৪অনলাইনের সাংবাদিকের দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার লক্ষীপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার বহিস্কৃত অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকার ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল হাকিমের জালিয়াতি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাত ও প্রতিষ্ঠানের জমি বিক্রির চিত্র।
বহিস্কৃত অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকার মাদ্রাসায় ১৯৮৬ সালে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করে পর্যায়ক্রমে সহকারী সুপার, সুপার,পরবর্তীতে অধ্যক্ষ হয়। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে। শিক্ষাবোর্ডের কাগজ জালিয়াতির মাধ্যমে গর্ভনিং কমিটি করে নিয়োগবাণিজ্য, প্রতিষ্ঠানের জমি বিক্রি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাত, প্রক্সি পরীক্ষার্থী দিয়ে পরীক্ষা দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ বার বার উঠে। জালিয়াতির মাধ্যমে কমিটি করে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে আদালতে একটি মামলাও চলমান রয়েছে এ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর একই প্রতিষ্ঠানের চুড়ান্ত বহিস্কৃত প্রভাষক আব্দুল হাকিম বিএনপির লোকজনের চাপে পুনরায় প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। এরপর তার পছন্দের লোকজনকে দিয়ে গর্ভনিং কমিটি করা হয়। সেই কমিটি অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকারকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে গত বছরের ২৭ মে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। এরপর আব্দুল হাকিমকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয় পরিচালনা কমিটি।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব নিয়ে আব্দুল হাকিম অফিসকক্ষ টাইলস, কিছু পুরাতন টিন পরিবর্তন করে ১৪ লাখ টাকা লোপাটসহ, প্রতিষ্ঠানের ৫৭ টি গাছ টেন্ডারের নামে বিজ্ঞপ্তির শর্ত পুরণ ছাড়াই নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের নামে বাগিয়ে নিয়ে ৭৩ টি গাছ কাটে। প্রতিষ্ঠানের ২০ একর জমি (২০২৫ সাল) এক বছরের জন্য ১০ লাখ টাকায় ইজারা দেয়। কিন্ত ৫ লাখ টাকা হিসাব নম্বরে জমা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল হাকিম বলেন, জমি ইজারা ১০ লাখ ৩ হাজারের মধ্যে ৭ লাখ ৪ হাজার টাকা হাতে আসে। গত বছরের শেষ চার মাস অফিস খরচ হাওলাদ করে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তৎকালীন পরিচালনা কমিটি থেকে জমি ইজারার টাকায় সমন্বয় করে পরিশোধ করতে বলা হয়। ২ লাখ ৪ হাজার টাকা হাওলাদ পরিশোধ করে বাকী ৫ লাখ টাকা হিসাব নম্বরে জমা হয়েছে। ইজারার বকেয়া টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছি।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য লুৎফর রহমান বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানের ৫৭ টি গাছ নিলাম দিলেও ৭৩ টি গাছ কাটা হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ করেছি। শিক্ষা অফিসার তদন্ত করে গেছেন।
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের নিয়ম থাকলেও মাদরাসা পরিচালনা কমিটি গত এক বছরেও অধ্যক্ষকে প্রত্যাহার করেননি। গত ৮ মার্চ মাদরাসা বোর্ডের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ছালেহ আহমাদের এক চিঠিতে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকারকে স্বপদে বহাল করা হয়।একই সাথে প্রস্তাবিত মাদরাসার পরিচালনা কমিটি বাতিল করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বেতন বিলে সাক্ষরের অনুমোদন দেওয়া হয়। বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকার সম্প্রতি মাদ্রাসায় যোগদান করতে গেলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজেডএম বজলুর রহমানের উপস্থিতিতে নেতাকর্মীদের বেধরক লাঠিপেটার শিকার হয়েছেন তিনি, তার স্ত্রী, শ্যালিকাসহ অন্তত ৬ জন।
আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও লক্ষীপুর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা গর্ভনিং সভাপতি রিপামনি দেবি বলেন,বহিস্কৃত অধ্যক্ষ আব্দুল মতিনের বিষয়ে আদালত ও ডিজি থেকে যে আদেশ দিবে সে অনুযায়ী কাজ করব। আর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল হাকিমের বিষয়ে অভিযোগ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিডি২৪অনলাইন/সি/এমকে