সময় ক্রমশ এমন গতিশীলতায় যে, পরমত সহিষ্ণু মানুষের চরম আকাল চলছে। আইনি মারপ্যাঁচের জটিলতা, সহিংসতা, মব জাস্টিস সমাজকে যেন একটু একটু করে গ্রাস করছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা শুধুই কাগজে কলমে। এমন পরিস্থিতিতে বিশৃংখলিত মিডিয়া জগত।
সর্বত্র সাংবাদিক নামধারি তথ্য সন্ত্রাসীদের হলুদ বর্ণচ্ছটার দাপটে মূলধারার রঙ বিবর্ণ সাংবাদিকদের অস্তিত্ব হুমকীর মুখে! একদিকে নৈতিক অবস্থানে থাকা সংবাকর্মীদের প্রতি মিডিয়া হাউজের বিমাতা সূলভ দৃষ্টিভঙ্গি! সততার ঝান্ডা তুলে ধরা সংবাদকর্মীদের পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েন। অন্যদিকে দেশের সর্বত্র স্টিকারযুক্ত বুম-অ্যান্ড্রয়েড হাতে, পেশাগত জ্ঞানহীন দাপুটে সংবাদিক নামধারী ব্যক্তিদের প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ‘ছুঁচোর’ মতো শুঁকে শুঁকে অসততার ভাগাড় হাতড়ে চলা!
এক সময় সচেতন মানুষেরা বাড়ি, অফিসে নিয়মিত পত্রিকা রাখতেন। অনেকে তো চা-নাস্তার টেবিলে বসে পত্রিকা পড়ে তবেই ঘরের বাইবে বের হতেন। সমঝদার পাঠকেরা সুযোগ পেলেই সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় পড়ে ফেলতেন। অথচ সময়ের ব্যবধানে সমঝদার পাঠকেরা এখন ছুটছেন উর্ধ্বশ্বাসে। তাদের পত্রিকা পড়ার সময় কোথায়! পরিবহণে বসে স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে স্ক্রল করে দেখছেন দেশ-বিদেশের টাটকা খবরের হেডলাইন!
তাদের
সিংহভাগেরই অজানা- রাজধানী, বিভাগ,
জেলা, উপজেলা ছাড়িয়ে গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত হচ্ছে রাষ্ট্র অনুমোদিত-অনুমোদনহীন প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক চ্যানেল, টিভি চ্যানেলের ভয়াবহ দাপট! যেখানে সংবাদ লেখার ঝামেলা নেই! তথ্য আইনের বালাই নেই! যার যখন ইচ্ছা কপি-পেস্ট সাংবাদিক সাজছেন।
হালের
স্বপ্নে বিভোর নেতারা ব্যক্তি প্রচারণার স্বার্থে অর্থের বিনিময়ে অনুমোদনহীন মিডিয়াকর্মীদের ভাড়া করে নিয়ে যাচ্ছেন! এমনকি আইনের মানুষেরাও দিব্বি তথাকথিত মিডিয়াকর্মীদের খাতির করছেন। রাষ্ট্রীয় অনুমোদনহীন মিডিয়াতে দিব্বি তারা সাক্ষাৎকার পর্যন্ত দিচ্ছেন!
এমন পরিস্থিতিতে সচেতন মানুষেরা অনেক সময় প্রশ্ন তোলেন- নেতারা না হয় বোকা! তারা হয়তো বোঝে না যে- অধিকাংশ ভোটার অসচেতন। তারা ফেসবুক-ইউটিউব ঘাটেন না। কারণ, তাদের হাতে অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন নেই। বাড়িতে স্মার্ট মুঠোফোন থাকলেও নেট পরিচালনায় দক্ষতা নেই! অর্থাৎ অনলাইন নিউজ পোর্টাল, অনলাইন নিউজ চ্যানেলে প্রচারণায় সুযোগ সন্ধানী ঐ নেতার পাঁচ শতাংশ ফলাফল অর্জিত হচ্ছে না। তবুও পাগলের মতো তারা টাকা দিয়ে ইউটিউবার-ফেসবুকারদের ভাড়া করছেন!
অন্যদিকে, প্রশাসনের বহু কর্মকর্তা এটা অনুধাবন করছেন না যে- অবৈধ মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেওয়া মানেই দেশে প্রচলিত আইনের প্রতি অবজ্ঞার সামিল! তথাপিও দিব্বি ইউএনও-ওসি সাহেবেরা অবৈধ মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে ধন্য হচ্ছেন! তাহলে প্রশাসনের ঐ সব কর্মকর্তারা কী সস্তা জনপ্রিয়তায় আগ্রহী?
গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজারে ভূঁইফোড় হলুদ সাংবাদিকদের এখন অবাধ বিচরণ। পথে-প্রান্তরে 'PRESS' স্টিকারযুক্ত রেজিস্ট্রেশনহীন বাইকের ছড়াছড়ি! ট্রাফিক পুলিশ আটকায় না, প্রশাসন সমীহ করে চলে, বিশাল ব্যাপার-স্যাপার আর কি!
দেশে যে হারে বৈধ-অবৈধ মিডিয়া হাউজ বাড়ছে। একই ধারাবাহিকতায় ঝাঁকে ঝাঁকে বাড়ছে কপি-পেস্ট মার্কা সংবাদকর্মীর সংখ্যা! ইদানিং সাংবাদিক-অসাংবাদিক সমন্বয়ে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে হাট-বাজার কেন্দ্রিক গড়ে উঠছে 'প্রেসক্লাব'! প্রেসক্লাব গঠন করে ধূর্ত সভাপতি-সম্পাদকেরা সমাজবিরোধী, মাদক কারবারি, জুয়াড়ি, ভূমিদস্যূ, মাছ লুটেরাদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে 'সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা'র সুনামের বারোটা বাজাচ্ছে।
মফস্বলে সাংবাদিক নামধারী কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে ফেঁসে গেলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের প্রেসক্লাব- এর শীর্ষ নেতারা অপরাধীকে রক্ষায় আদাজল খেয়ে লাগছেন। ফলে অপরাধ করেও অনেক অপরাধী রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে! এভাবে দিন দিন 'প্রেসক্লাব সিন্ডিকেট'-এর কারণে কলম সন্ত্রাসীরা রীতিমতো প্রশ্রয় পাচ্ছে!
এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ মাধ্যমের মান নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ মিডিয়া হাউজগুলো বন্ধ করা, সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা নিশ্চিত করা, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে প্রেস ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে নিবন্ধিত করা, সাংবাদিক সংগঠনে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ এবং প্রেস এ্যাক্ট অনুযায়ী অপরাধী সাংবাদিকদের বিচারের মুখোমুখি করার কঠোর ব্যবস্থা চালু করা আশু প্রয়োজন।
এছাড়াও জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয় সাধন ও পেশাগত মনিটরিং সেল চালু করা দরকার। যেমন- প্রতিটি উপজেলা প্রেসক্লাবের নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধিকে জেলা প্রেসক্লাব নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের এবং প্রতিটি জেলা প্রেসক্লাবের নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধিকে বিভাগীয় প্রেসক্লাব নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ রাখা। একইভাবে জাতীয় প্রেসক্লাব নির্বাচনে প্রতিটি বিভাগীয় প্রেসক্লাবের নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধিকে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে সাংবাদিকতা পেশাজীবিদের গুণগত মানোন্নয়ন এবং সুশৃংখল পরিবেশ ফেরানো সম্ভব বলে মনে হয়। 'সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা' সেক্টরকে দায়িত্বশীল করতে পারলে সারাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণসহ সামাজিক অপরাধ বহুলাংশে হ্রাস পাবে বলে মনে করি। কারণ, তথাকথিত 'সাংবাদিক' মানেই তারা কিন্তু মহামানব নয়।