মৌসুমের শুরুতেই ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁক-ডাক পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় লিচুর আড়ৎ নাটোরের গুরুদাসপুরের বটতলা বাজার| উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাষিরা লিচু নিয়ে ছুটছেন আড়তে আড়তে| দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব আড়তে আসছেন পাইকাররা| প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি ট্রাকযোগে গুরুদাসপুরের লিচু ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে|
জানা গেছে, উপজেলার ৫৭৫টি বাগানে শোভা পাচ্ছে পরিপক্ব লাল টসটসে লিচু| গতবছরের মতো এ বছরও ৪১০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে| উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্যমতে,এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭০০ টন| এর মধ্যে ৩৯৫ হেক্টর জমিতে আগাম মোজাফফর লিচু, ১৫ হেক্টর জমিতে বোম্বাই ও চায়ানা-৩ জাতের লিচুর আবাদ হয়েছে| এ এলাকায় উৎপাদিত লিচুর বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা|
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৬টি ইউনিয়নজুড়ে কমবেশি লিচু চাষ হয়| এর মধ্যে নাজিরপুর ইউনিয়নে চাষ হয় সবচেয়ে বেশি| এই ইউনিয়নের বেড়-গঙ্গারামপুর কানু মোল্লার বটতলায় রয়েছে মায়ের দোয়া বাণিজ্যালয়, ভাই ভাই ফল ভান্ডার, সততা ফল ভান্ডার, মোল্লা ফল ভান্ডার, বিসমিল্লাহ ফল ভান্ডার, মক্কা-মদিনা ফল ভান্ডার, সোনালি ফল ভান্ডার, তালুকদার ফলভান্ডারসহ অন্তত ১৫টি লিচুর আড়ত|
লিচু আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন প্রাপ্ত থেকে চাষিরা তাদের উৎপাদিত লিচু নিয়ে আসছেন| প্রতিদিন সকাল ও বিকাল দু’বেলা প্রকাশ্য ডাকের মাধ্যমে লিচু কেনাবেচা চলে| দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা লিচুগুলো কিনে বাঁশের ঝুড়িতে ভরে ট্রাকযোগে তাদের গন্তব্যে পাঠাচ্ছেন| প্রতি ঝুড়িতে ২ হাজার ২০০টি লিচু থাকে। আর প্রতি ট্রাকে ২০০ ঝুড়িতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ পিস লিচু নিয়ে পাইকাররা ছুটছেন যার যার গন্তব্যে|
নাজিরপুর, জুমাইনগর, মামুদপুর, মোল্লাবাজার, বিন্যাবাড়ী, বিয়াঘাট,যোগেন্দ্র নগর,আনন্দ নগর, এলাকার অন্তত ১০ জন চাষির সঙ্গে কথা হয়| তারা জানান, এ বছর অনুকুল আবহাওয়ার কারনে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে| দাম ভালো থাকা ও অসন্ন বিরুপ আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই তারা লিচু বিক্রি করছেন| বর্তমানে মানভেদে প্রতি হাজার লিচু বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়| ভালো দামে খুশি তারা|
মায়ের দোয়া বাণিজ্যালয়ের মাহবুব জানান, গত ১০ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্রাবনী রায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর জমে উঠেছে এ আড়তের কেনাবেচা| ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখোরিত হয়ে উঠেছে এ অঙ্গন| এ বছর রং ও আকার মানভেদে প্রতি হাজার লিচু ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে| এ এলাকার লিচুর স্বাদ, রং, গন্ধ এবং আকারের কারণে দেশব্যাপী সুখ্যাতি রয়েছে| রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামে এখান থেকে লিচু কিনছেন|
আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোতালেব মোড়ল বলেন,গত ৯ মে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে লিচু-ক্রয় বিক্রয়ের উদ্বোধন করা হয়েছে| এ অঞ্চলের লিচুর স্বাদ,রং গন্ধ দেশের অন্য যে কোন এলাকার থেকে আলাদা বলে দেশজুড়ে খ্যাতি রয়েছে| তাছাড়া কেমিক্যালমুক্তের কারনে ক্রেতা চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক| আড়তের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন কোটি টাকার লিচু বিক্রি হচ্ছে| সারা দিন পাইকারি লিচু বেচাকেনা হয়| বাগান পাহারা, লিচু সংগ্রহ, ঝুটি বাঁধা,প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বেচাকেনায় দৈনিক ৭ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়|
যশোরের পাইকার হারুন শেখ বলেন, গুরুদাসপুরের আগাম জাতের লিচুর চাহিদা বেশি থাকায় তিনি প্রতি বছরই এ আড়ৎ থেকে লিচু কিনে নিজ জেলায় বিক্রি করেন| সপ্তাহে দুই ট্রাক লিচু ক্রয় করেন তিনি|
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম রাফিউল ইসলাম বলেন, লিচু গুরুদাসপুরের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি| উপজেলার ৪১০ হেক্টর জমির ৫৭৫টি বাগানে ৩ লাখ ৭০০ টন লিচুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে| যার বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা| কৃষি বিভাগের পরামর্শ,অনুকুল পরিবেশ এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে| ভালো দামে চাষিরা খুশি|
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ জানান, “দেশব্যাপী গুরুদাসপুরের লিচুর খ্যাতি রয়েছে| লিচুর আড়তগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যাপারীদের সব ধরনের সমস্যা সমাধানের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন তদারকি করছে| ব্যবসায়ী ও চাষীদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন বাণিজ্য নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে|”
বিডি২৪অনলাইন/সি/এমকে