দেশের
শিল্পকারখানায় বা
বাসাবাড়িতে পযাপ্ত গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না। কোথাও সরবরাহ কম, কোথাও চাপ এতোই কম- উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া বা রান্নার চুলা
জ্বালিয়ে রাখা কঠিন। ফলে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন কমে যাওয়ার মাশুল গুনতে হচ্ছে। ভোগান্তির
শেষ হচ্ছে না বাসাবাড়িতে। পরিস্থিতি সামলাতে এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বাড়ছে ভর্তুকির চাপও। এমন পরিস্থিতেতে চড়া দামের খোলা বাজারে (স্পট মার্কেটে) কেনাকাটা কমিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির
আওতায় এলএনজি কেনার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এতে খরচ কমানোর সুযোগ হলেও আন্তর্জাতিক সরবরাহে বাধা, ভাসমান টার্মিনালের সমস্যা এবং জরুরি মজুতের ঘাটতি আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে রেখেছে। এ
অবস্থায় দেশীয় গ্যাস
অনুসন্ধান ও উৎপাদন না
বাড়ালে শুধু আমদানি দিয়ে সংকটের
টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা
যায়, এলএনজিতে চলতি
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভর্তুকির
বরাদ্দ ১০ হাজার ৩০০
কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৩০ কার্গো এলএনজি
কিনতে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি
টাকা খরচ হয়েছে। গত
অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি
ছিল ১৪ হাজার ৬০০
কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রথম তিন মাসের ভর্তুকি আগের পুরো বছরের প্রায় ৭১ শতাংশ। এ
হারে ব্যয় চললে বছরে ভর্তুকির প্রয়োজন ৪১ হাজার কোটি
টাকা ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে
চলতি অর্থবছরের
জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি
টাকা প্রয়োজন জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সংশোধিত বাজেটের আগে আর বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে সংস্থাটিকে।
বরাদ্দ না বাড়লে বছরের
বাকি সময়ে আমদানির আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এমনটাই জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার
এক কর্মকর্তা।
ওদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিনিয়ত এলএনজির দাম ওঠানামা করছে । বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে অতিরিক্ত দাম বাড়ে। আবার শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও দাম বাড়ে। এর চাপ পড়ে দেশের অর্থনীতির ওপর। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। তার কয়েক বছর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪১ কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, স্পট মার্কেটে দাম দ্রুত ওঠানামা করে। যুদ্ধ বা সরবরাহে বাধা দেখা দিলে বেশি দাম দিতে হয় আমদানিকারক দেশকে । মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে এই বাজার থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ মার্কিন ডলারে কিনত বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ দাম প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডলারে উঠেছে।
চলতি অক্টোবরের জন্য কেনা কয়েকটি স্পট কার্গোর দাম প্রায় ২৭ থেকে ২৯ মার্কিন ডলার পড়েছে। একই সময়ে স্বল্পমেয়াদি ও চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে কেনা প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ২৫ দশমিক ২৬ থেকে ২৫ দশমিক ৩৫ ডলার খরচ হয়েছে। স্পটের চেয়ে চুক্তিভিত্তিক কেনাকাটায় খরচ কম হলেও ক্রয়ের সময়, সরবরাহের শর্ত ও দামের সূত্র ভিন্ন হওয়ায় সব কার্গোর জন্য একইরকম সাশ্রয় ধরে নেওয়া যায় না। কম দামের নির্ধারিত সরবরাহ ব্যাহত হলে বিকল্প উৎস থেকে কিনতে হয় বেশি দামে। আবার কার্গো পৌঁছালেও টার্মিনালে কারিগরি বা পরিবেশগত সমস্যা হলে সেই জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে সময় মতো পৌঁছানো যায় না। ফলে বেশি অর্থ ব্যয় করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-এর একাধিক ব্যাবসায়িক নেতা জানিয়েছেন, আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি সংকটের মূল্য দিচ্ছে দেশের শিল্প খাত। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ ঘাটতিতে পোশাক খাতের উৎপাদন একপর্যায়ে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনা বারবার বদলাতে হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানির পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় উৎপাদনে বড় সমস্যা বা এলএনজি আমদানিতে বাধা তৈরি হলে এ সরবরাহ ২২৫-২৩০ কোটি ঘনফুটেও নেমে আসছে। গ্যাস না পেলে কিছু কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে। উৎপাদন কমলে কারখানার অনেক স্থায়ী খরচ থেকে যায়। কম পণ্যের ওপর সেই খরচ ভাগ হওয়ায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে রপ্তানির প্রতিযোগিতা, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। টিকে থাকতে খুচরা দাম একই রেখে স্থানীয় পণ্যের সাইজ ও পরিমাণ কমিয়ে বাজার চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে অনেক কোম্পানি।
বিডি২৪অনলাইন/এনএন/এমকে