দেশের নদ-নদীর পানিতে উদ্বেগজনক হারে বিষাক্ত ভারী ধাতুর দূষণ বাড়ছে। শুরুতে রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতে এ দূষণ সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন উপকূলীয় নদী ও মোহনাতেও সেটা ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে রীতিমতো ঝুঁকির মুখে পড়ছে মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান এবং গবেষণা সহকারী কাজী নুসরাত জাহান ঐশীর যৌথ গবেষণায় পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক ফলাফল। চট্রগ্রাম অঞ্চলের মাতামুহুরী, বাঁকখালী ও নাফ নদী, মহেশখালী চ্যানেল, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত হয়েছে এ গবেষণা।
আধুনিক আধুনিক ল্যাব টেকনোলজি সংক্রান্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদী ও মোহনার পলিতে জমে থাকা ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম, নিকেল, সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয় গবেষণায়। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে (এলসেভিয়ার) প্রকাশ হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাঁকখালি নদী ও মহেশখালী চ্যানেল দূষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এ দুই জায়গায় পিএলআই মান ২-এর বেশি, যা উচ্চ মাত্রার দূষণের ইঙ্গিত প্রকাশ করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ধাতু হিসেবে ক্যাডমিয়াম শনাক্ত হয়েছে সেখানে। এর উচ্চ বিষক্রিয়ার কারণে পিইআর মান বাঁকখালিতে ৩৩১.৯১ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ২৯৫.৪৩ শতাংশ। এ মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
এ দূষণের মূল কারণ তুলে ধরা হয়েছে গবেষণায়। বলা হয়েছে, শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগর পয়োনিষ্কাশন থেকে নিঃসৃত পানি, জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম, বন্দরভিত্তিক নৌচলাচল এবং কৃষি ও নগর এলাকা থেকে বয়ে আসা দূষিত নদী নিষ্কাশন এর কারণ। চট্টগ্রাম ও মহেশখালী অঞ্চলে এসব কার্যক্রমের ঘনত্ব বেশি, তাই সেখানে দূষণের চাপও বেশি। এ দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদের ওপর। পলিতে জমে থাকা ধাতু ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও প্লাংকটনের শরীরে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছ ও চিংড়িতে চলে আসে। এতে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফল হিসেবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমতে থাকে। এতে একদিকে যেমন জেলেদের আয় কমছে। অন্যদিকে দূষিত মাছ খাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, দূষণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলে ইকোসিস্টেমে অস্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্যসম্পদের পতন ঘটতে পারে কিছু অঞ্চলে। এটা উপকূলীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বিডি২৪অনলাইন/এনএন/এমকে