ভ্যাপসা গরম আর তীব্র লোডশেডিং গ্রামের সাধাণ মানুষদের স্বস্তি দিতে হাতপাখাই একমাত্র ভরসা। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প তালপাতার পাখা। তবে বর্তমানে অসহনীয় গরমে স্বস্তি এন দেওয়া তাল পাখার দাম ও কদর দুটোই বেড়েছে।
নাটোরের চাঁচকৈড় বাজারে তালপাখা বিক্রেতা রায়হান আলী জানান, তালপাতা গাছ থেকে সংগ্রহ করে তিন-চার ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পানি থেকে তুলে রোদে শুকাতে হয়। এরপর ধারালো দেশীয় অস্ত্রে কেটে পাতাকে পাখার মতো আকার দেয়া হয়। পরে তা সুতার সাহায্যে বাঁধাই করা হয়। এরপর হাতল ও পাখার বাড়তি অংশ কেটে ফেলে রঙ করলেই তা বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে।
তিনি আরো জানান, শ্রমিক মুজুরী,তালপাতা সংগ্রহ,প্রক্রিয়াজাত করণ,বাধাই ও রংকরণ মিলে একটি পাখা তৈরীতে খরচ হয় ১৫ থেকে ২০ টাকা। একজন কারিগর সারাদিনে ২০ থেকে ৩০টি পাখা তৈরি করতে পারেন। আকার ও মানভেদে প্রতিটি পাখা বিক্রি হয় ২০ থেকে ৫০ টাকা। পাখা বিক্রির আয়ে চলে সংসার।
গুরুদাসপুর রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মাজেম আলী বলেন,আজকাল প্লাস্টিক ও বৈদ্যুতিক পাখা, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি আধুনিক সামগ্রীর বাজারে তালপাখা হারিয়ে যাচ্ছিল। তবে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মানুষ এখন নতুন করে পরিবেশ বান্ধব তাল পাখাকে ঠান্ডার পরশ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। সুদিন ফিরেছে পালপাখার। তবে কাঁচামালের সঙ্কট ও মুনাফা কম হওয়ায় পেশা বদলে ফেলছেন তালপাখার কারিগররা। যারা এখনো এ পেশায় আছেন তাদের অবস্থা ভালো নয়। এ কারু শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরী।
লোকসংস্কৃতি সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তালপাতার হাতপাখা আবারও দেশীয় হস্তশিল্প হিসেবে নতুন পরিচয় পেতে পারে। অন্যথায় বাংলার হাজার বছরের এই ঐতিহ্য অচিরেই শুধু বইয়ের পাতায় আর স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেগম রোকেয়া স্কুল এ্যন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক শাহনাজ বেগম বলেন,বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এ পাখার একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এ পাখাকে ঘিরে অসংখ্য শ্লোক,কবিতা ও গান রচিত হয়েছে। গ্রামবাংলার অতি পরিচিত প্রবাদ-'তালের পাখা প্রাণের সখা, শীতকালে হয় না দেখা, গরমকালে হয় যে দেখা।' এছাড়াও রোমান্টিক গান-'তোমার হাতপাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে, আরও কিছু সময় তুমি থাকো আমার পাশে।' গ্রামীন ঐতিহ্যের ধারক এ তাল পাখা শিল্পকে বাঁচিতে রাখতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
ইতিহাস বলছে, ভারতীয় উপমহাদেশে তালপাতা ও প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হাতপাখার ব্যবহার দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যময় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই তালের পাখা। তালপাতার পাখা শুধু গরম নিবারণের উপকরণ নয়, ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। ঘামে ভেজা কপালে মায়ের হাতের এই পাখার বাতাস ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দামি এবং শান্তির স্পর্শ। বাংলার লোকশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন এই পাখা।
বিডি২৪অনলাইন/সি/এমকে