মর্টার তৈরির প্রতিযোগিতায় বিশ্বমঞ্চে চুয়েটের ‘টিম চুয়েট সি’

সুলতান শাহরিয়া শাফি, চুয়েট
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সিমেন্ট, বালু, পানি, অ্যাডমিক্সচার সম্পূরক সিমেন্টীয় উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি হয় মর্টার। একটি ভালো মর্টার তৈরির চ্যালেঞ্জ শুধু উপকরণ মেশানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে প্রবাহক্ষমতা, স্থিতিশীলতা, পরিবেশগত প্রভাব উৎপাদন খরচসবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। এই চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীদের দলটিম চুয়েট সি

বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে দলটি অংশ নিচ্ছে আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) আয়োজিতএসিআই মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি কম্পিটিশন ২০২৬’-এ। আগামী ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টার হিলটন হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিযোগিতার মূল পর্ব।

 

আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে প্রথমে পেরোতে হয়েছে বাছাইপর্ব। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া দলগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর নির্বাচিত হয়েছে সেরা ৪০টি দল। সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে চুয়েটেরটিম চুয়েট সি

দলটির উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার-চুয়েটের অনুষদ উপদেষ্টা চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক জি. এম. সাদিকুল ইসলাম। দলের সদস্যরা হলেন খন্দকার ফাহাদ আলম, সুমাইয়া বিনতে মান্নান, তানজিম মোশাররাত হোসেন, স্বরূপ চন্দ্র মোদক, সানিউল হক, রূপম পোদ্দার, মো. সাইজউদ্দিন ফরহাদ এবং এস এম আমীর হামজা মাহমুদ মাহাদী।

 

এদিকে প্রতিযোগিতার মূল পর্বে দলের প্রতিনিধিত্ব করতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন চার সদস্যখন্দকার ফাহাদ আলম, সুমাইয়া বিনতে মান্নান, তানজিম মোশাররাত হোসেন স্বরূপ চন্দ্র মোদক। সেখানে বিচারকদের সামনে নিজেদের গবেষণার ধারণা, ব্যবহৃত উপকরণ প্রস্তুতকৃত মর্টার উপস্থাপন করবেন তারা।

 

নিজের অনুভূতি জানিয়ে দলের সদস্য স্বরূপ চন্দ্র মোদক বলেন, “একাডেমিক পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি নিয়মিত ল্যাবরেটরিতে সময় দেওয়া, একের পর এক পরীক্ষামূলক মিশ্রণ তৈরি করা এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করতে গিয়ে অনেক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে যখন জানতে পারলাম আমাদের দল বিশ্বের সেরা ৪০টি দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়ার মতো জটিল ধাপগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি, তখন সব পরিশ্রমই সার্থক মনে হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভালো কিছু করার এবং দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনার আশা করছি।

 

দলের উপদেষ্টা অধ্যাপক জি. এম. সাদিকুল ইসলাম বলেন, “২০১৮ সালে এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার, চুয়েট প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছয়টি পুরস্কার অর্জন করেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে এসব সাফল্যই ছিল অনলাইনভিত্তিক প্রতিযোগিতায়। এবার আমরা অত্যন্ত আনন্দিত উচ্ছ্বসিত যে, আমাদের দল সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য আটলান্টায় যাচ্ছে। আমরা আশা করি, অনলাইনভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোতে তারা যেমন সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, এবারও সরাসরি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারা ভালো সাফল্য অর্জন করতে পারবে।

জানা গেছে, প্রতিযোগিতায় মর্টারের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে প্রবাহক্ষমতা স্থিতিশীলতাকে। মোট নম্বরের ৫০ শতাংশ নির্ধারিত হবে প্রবাহক্ষমতার ওপর এবং ২০ শতাংশ স্থিতিশীলতার ওপর। ছাড়া কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের জন্য ১০ শতাংশ, অর্থনৈতিক সাশ্রয়িতার জন্য শতাংশ এবং প্রতিবেদনের মানের জন্য ১৫ শতাংশ নম্বর থাকবে।

দলের সদস্যদের মতে, প্রবাহক্ষমতা স্থিতিশীলতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করাই ছিল প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মর্টারের প্রবাহক্ষমতা বাড়াতে গেলে অনেক সময় স্থিতিশীলতা কমে যায়। আবার স্থিতিশীলতা বাড়াতে গেলে ব্যাহত হতে পারে প্রবাহক্ষমতা। তাই কোনো একটি বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য না দিয়ে দুটির মধ্যে সর্বোত্তম সমন্বয় তৈরি করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে একের পর এক পরীক্ষামূলক মিশ্রণ তৈরি করেছেন তারা। পরিবর্তন করা হয়েছে মিশ্রণের বিভিন্ন অনুপাত এবং পরীক্ষা করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডমিক্সচার। প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত মিশ্রণের দিকে এগিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

 

পরিবেশগত প্রভাব কমানো উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। ক্ষেত্রে সম্পূরক সিমেন্টীয় উপাদান ব্যবহারের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ফলে মর্টারের কার্যকারিতার পাশাপাশি পরিবেশ অর্থনৈতিক দিকও বিবেচনায় রাখা হয়েছে চূড়ান্ত মিশ্রণ তৈরিতে।

 

প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতার মূল পর্বে বিশেষ ছাঁচের মাধ্যমে মর্টারের প্রবাহক্ষমতা যাচাই করা হবে। মর্টার নির্ধারিত ছাঁচ কত দ্রুত পূরণ করতে পারে, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে এর প্রবাহক্ষমতা। অন্যদিকে স্থিতিশীলতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা হবে তলানি জমা উপাদান পৃথকীকরণের মাত্রা। নির্দিষ্ট পরিমাণ মর্টার একটি পরিমাপক চোঙে রেখে পর্যবেক্ষণ করা হবে মিশ্রণের উপাদানগুলো কতটা আলাদা হয়ে যায়। উপাদান পৃথকীকরণ যত কম হবে, মর্টারকে তত বেশি স্থিতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

 

উল্লেখ্য, আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। কংক্রিট নির্মাণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মানদণ্ড, কোড প্রযুক্তিগত জ্ঞান তৈরি প্রচারে কাজ করে সংস্থাটি। বর্তমানে বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশে ৩৫ হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এসিআই। সংস্থাটির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে অবস্থিত।

 

বিডি২৪অনলাইন/সি/এমকে


মন্তব্য
জেলার খবর