উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা, সুশাসনের অভাব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা- এসব উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। এসব কারণে চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক খাতের লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিংয়ের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে আবার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কজনিত ধাক্কার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বৈদেশিক খাত থেকেও । এসব কারণে একদিকে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। যদিও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে মন্থরগতি, কঠোর মুদ্রানীতি ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয়ের ফলে মূল্যস্ফীতির হার আগামীতে কিছুটা কমতে পারে। বুধবার (২০ মে) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ চিত্র ফুটে উঠেছ। থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এর মধ্যে সম্প্রতি দেশে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রেই নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে অর্থনীতিতে । মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট অস্থিরতা এসব চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশে দীর্ঘ দিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারা এখনো রয়ে গেছে।বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা বিদ্যমান রয়েছে এখনো। এছাড়া বিভিন্ন খাতে সুশাসনের ঘাটতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতিতে রয়েছে অনিশ্চয়তা। এর বাইরেও আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগোতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বেসরকারি খাতের ধীরগতির বিনিয়োগ ও সামাজিক অস্থিরতা থেকে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলায় বাধার সৃষ্টি হয়েছে। নানা অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও কমেছে। ফলে বিদায়ি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমেছে, দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে । এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানির সঙ্গে দেশে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমূখী হচ্ছে। এর ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কজনিত কারণে আগামীতে মূল্যস্ফীতির হারে ঝুঁকি সৃষ্টি পারে। শুল্কের কারণে রপ্তানি আয় কমলে কমে যেতে পারে ডলারের জোগানও। এতে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়ে রীতিমোত ধাক্কা লাগতে পারে মূল্যস্ফীতিতে।
ওদিকে দেশে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন বেড়ে কিছুটা কমাতে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ। তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমলে, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল হলে এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও হ্রাস পেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণের উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও তারল্য সংকটের কারণে মন্থির গতি ছিল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মন্থর, মার্কিন শুল্কের আঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রকট অনিশ্চয়তাসহ বৈশ্বিক প্রতিকূলতা দেশের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনাকে সীমিত করে দিতে পারে। তবে এডিপি কর্মসূচিতে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করতে পারে। এত বাড়তে পারে কর্মসংস্থানের হারও।
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ১০ শতাংশ, রেমিট্যান্স প্রবাহ ৮ শতাংশ, আমদানি ব্যয় ৮ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বছর শেষে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের পৌঁছাবে। তবে এসব পূর্বাভাস বিশ্বব্যাপী চাহিদার পরিস্থিতি, পণ্যের দামের ওঠানামা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির ও পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এমন পরিস্থিতিতে মধ্যমেয়াদে টেকসই প্রবাসী আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার নমনীয় বিনিময় হারের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারলে চাপ কমতে পারে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর। তবে বৈশ্বিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং শুল্কজনিত আঘাতের কারণে চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়ে গেছে বৈদেশিক খাতে।
ওদিকে রাজস্ব আয় কমায় ব্যাংক থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে সরকার। এ অতিরিক্ত ঋণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকারের রাজস্ব আহরণ দুর্বল হওয়ায় ঋণের চাপ থেকে মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, দারিদ্র্য বিমোচন ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে সরকারকে। রাজস্ব আয় বাড়লে ঋণ কম দেবে, ব্যাংকের তারল্য বাড়বে ও ঋণের সুদের হার কমে। তখন বেসরকারি খাত বাড়তি ঋণ নেবে। এছাড়া রাজস্ব আয় বাড়লে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে সরকার। তখন বেসরকারি খাতও বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে।
বিডি২৪অনলাইন/ইএম/এমকে