নতুনভাবে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করার দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে এ বোর্ড গঠন করা হয়। আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে এ বোর্ড গঠনের পরও শান্ত হয়নি শিল্পাঞ্চল। টানা তৃতীয় দিনের মতো গেল সোমবারও (২ নভেম্বর) পোশাক কারখানায় অস্থিরতা ছিল, এদিনও বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করেছে পোশাকশ্রমিকরা। এ অস্থিরতা শুরুর পর গত তিন দিনে অন্তত ৭০০ পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
শ্রমিক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সোমবার গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। তাদের সঙ্গে ছিল ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। আশুলিয়ার নরসিংহপুরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বিক্ষোভ দমনে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেয় ও তাদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। আটক করা হয় দুজনকে। ওদিকে গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও মিরপুরের বেশকিছু কারখানায় কাজ বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয় শ্রমিকরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ও সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচেনায় কারখানাগুলোতে সাধারণ ছুটি ও বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। এর মধ্যে ৬৮০টি কারাখানা পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য। এ তালিকায় বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (বিকেএমইএ) তালিকাভুক্ত ২০টি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
আন্দোলনে নামা পোশাকশ্রমিকদের দাবি, তাদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলনরতদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ করতে হবে। আর ইতোমধ্যে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে।
বিজিএমই সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে সংগঠনটির ৬৭০টি সদস্য কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। বিকাল আরও অন্তত ১০টি কারখানা বন্ধের খবর পাওয়া গেছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে নারায়ণগঞ্জের ২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক রয়েছে।
শ্রমিক
আন্দোলন শুরু সাভারের আশুলিয়া থেকে। সেখানকার কাঠগড়া, আমতলা ও নয়াপাড়া এলাকায়
গেল শনিবার সকালে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। প্রথমে নাঈম নিটওয়্যারের কর্মীরা কারখানায় কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে কারখানা থেকে
বের হয়ে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করে।
এদিকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সোমবার প্রায় ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে পুলিশ ও বিজিবি টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অন্যদিকে কালিয়াকৈরে একটি কারখানার ঝুটের গুদাম ও একটি পিকআপভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ওদিকে বিক্ষোভ সংঘর্ষের ঘটনায় রোববার মিরপুরে ২৯ জন ও গাজীপুরে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যমেত, শ্রমিক অসন্তোষ সামাল দিতে রোববার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। এদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক হয়। একই দিন বিজিএমইএ জানায়, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে তাদের।
নবগঠিত মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। ৬ সদস্যের এই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। নিরপেক্ষ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, শিগগিরই বোর্ডের সভা করে স্বল্প সময়ে মজুরি ঘোষণা হতে পারে। তবে আন্দোলনের নামে আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।
এদিকে ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, শ্রমিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে অস্থিরতা সৃষ্টির তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনা সফল হবে না। যথাসময়ে মজুরি নির্ধারণের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগের পরও একটি চিহ্নিত মহল গার্মেন্টসকে অস্থিতিশীল করতে অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়াও জানান, আন্দোলনে বহিরাগতদের যোগ দেওয়ার তথ্য আছে পুলিশের কাছে। তাদের আটকের চেষ্টা চলছে। মজুরি বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন স্থানের ঘটনা শ্রমিক আন্দোলন নয় বলে মন্তব্য করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য এই আন্দোলন ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।