ন্যূনতম
মজুরি নির্ধারণসহ বেশ কয়েক দফা দাবি আদায়ে টানা কয়েকদিন ধরে শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের
বিক্ষোভ-আন্দোলন চলছে। চলমান শ্রমিক
অসন্তোষ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে
বন্ধ হয়েছে বিপুলসংখ্যক কারখানার উৎপাদন। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির
(বিজিএমইএ) তথ্যমতে, গেল চার দিনে প্রায় ৭০০ কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে এই আন্দোলনের কারণে। গার্মেন্টেসে
এভাবে একের পর
এক তালা পড়লে চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস। হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়ায় এসব কারখানার লাখ লাখ শ্রমিক ও তাদের ওপর
নির্ভরশীল পরিবারগুলো পড়বে চরম আর্থিক সংকটে। এই পরিস্থিতি দেশের জন্য উদ্বেগের বলে মনে করছেন বোদ্ধামহল। তাদের মতে,
পরিস্থিতি সামলাতে না পারলে শেষ
পর্যন্ত এই অন্তোষের নেতিবাচক
প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতি ও সমাজে। এতে বিপদের
মুখোমুখি হতে পারে
কোটি মানুষ।
প্রাপ্ত
তথ্য মতে, বর্তমানে প্রায়
৪০ লাখ মানুষ এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ, ৮০ শতাংশের বেশি
আসে এ খাত থেকে।
জিডিপিতে এর অবদান ৮
শতাংশের বেশি। ফলে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে শুধু শ্রমিকদের আয় বন্ধ হবে
না, এর সঙ্গে যুক্ত বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
একের পর এক কারখানায় তালা ঝুলতে থাকলে কমবে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, চাপে পড়বে ব্যাংকঋণ ও রাজস্ব আদায়। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের রপ্তানি বাজার। আয়হীন মানুষে সংখ্যা বাড়লে বাড়তে পারে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতা।
শুধু তাই নয়, পোশাকশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত সহযোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠানও চাপের মুখে পড়বে। সুতা, কাপড়, ডাইং, ওয়াশিং, প্রিন্টিং, বোতাম, জিপার, কার্টন ও প্যাকেজিং শিল্পের বড় অংশের ব্যবসা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি পরিবহণ, বন্দর, শিপিং, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর করে। কারখানায় উৎপাদন কমলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ ও আয়ও স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে।
ওদিকে
শ্রমিকদের আয় কমে
গেলে শিল্পাঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরের মতো
এলাকায় শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য
দোকান, বাজার, হোটেল, পরিবহণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা।
শ্রমিকদের আয় বন্ধ হলে
এসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রিও কমবে। ফলে কর্মসংস্থানের সংকট শুধু কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ছড়িয়ে পড়বে।
অর্থনীতিবিদরা জানান, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ধীরগতির মধ্যে রয়েছে। নতুন করে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। জিডিপি প্রবৃদ্ধিও সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এমন অবস্থায় গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেলে বা বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়লে বেকারত্ব আরও বাড়বে এবং অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হবে। অর্থনীতি আরও খারাপ হলে অপরাধপ্রবণতাও বাড়তে পারে। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই রাজনীতি আনা উচিত নয়। মানুষের পেটের ক্ষুধা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে রাজনীতি করা ঠিক হবে না।
এদিকে দাবি অনুযায়ী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার নির্ধারণ করলে এর পরবর্তী জটিলতা ও ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। অর্থনীতিবিদের অনেকেই মনে করছেন, আকাশচুম্বী দাবি করা ও সেটা মেনে নিলেই কেবল হবে না। এর দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব নিয়েও ভাবতে হবে। বিদেশি ক্রেতারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে পণ্য কিনতে চাইবেন না। আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বেড়েছে প্রতিযোগিতা । ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পণ্যের দাম বেশি হলে বাংলাদেশ থেকে পোশাক না কিনে ভিয়েতনাম, ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে চলে যেতে পারে তারা।
বিডি২৪অনলাইন/এনএন/এমকে