ঢাকা - অক্টোবর ১৭, ২০১৯ : ২ কার্তিক, ১৪২৬

শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন‍

নিউজ ডেস্ক
অক্টোবর ০৫, ২০১৯ ১১:৪৫
৪৭ বার পঠিত

আলোকিত জনগোষ্ঠী গড়তে বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক দশকে শিক্ষার সর্বস্তরেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। শিক্ষার এই ব্যাপক অগ্রগতি ও সক্ষমতা অর্জন অর্থনীতির ভিত্তিকেও করেছে মজবুত ও টেকসই, দেশকে বিশ্বের বুকে দিয়েছে পৃথক পরিচিতি। একসময় বিপুলসংখ্যক কোমলমতি শিশু স্কুলে যাওয়ারই সুযোগ পেতো না। অনেকে আবার স্কুলে গেলেও প্রাথমিক পর্যায় থেকে ঝরে পড়তো। পাবলিক পরীক্ষায় ছিল নকলের ছড়াছড়ি। ফল প্রকাশে যেমন দেরি হতো, আবার প্রকাশের পর দেখা যেতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য। স্কুলে যথাসময়ে পাঠ্যবই পেতো না শিশু-কিশোররা। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অসংখ্য তরুণীকে বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে নির্মম জীবন বেছে নিতে হতো। গত কয়েক বছরে বদলে গেছে শিক্ষাক্ষেত্র, পাল্টে গেছে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। তাইতো বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের সাফল্যের তালিকায় শীর্ষে নিঃসন্দেহে শিক্ষা। বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় শিক্ষাবিস্তারে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে বর্তমান সরকার। শিক্ষার আলোয় এখন আলোকিত পুরো বাংলাদেশ।

নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে নতুন মাইলফলক। বাংলাদেশে শিক্ষায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিলসে সময় ৮০ শতাংশ নারী ছিল শিক্ষা বঞ্চিত। একসময় নারী শিক্ষা শুধু উচ্চবিত্ত ও শহরের কিছু পরিবারে সীমাবদ্ধ ছিল। সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে সবার প্রশংসা অর্জন করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সবার জন্য বৃত্তি থাকলেও, মাধ্যমিক পর্যায়ে শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য বৃত্তি রাখা হয়েছে। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার ভেতরে বাংলাদেশ সবার ওপরে অবস্থান করছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

প্রাথমিক শিক্ষায় সাফল্য তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। নিরক্ষরতা দূরীকরণেও অর্জিত হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। দশ বছর আগে যেখানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা শতভাগ। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির হার ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬২ শতাংশ, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তির হার ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। বাংলাদেশে বয়স্ক শিক্ষার হার উন্নীত হয়েছে ৫৯ শতাংশে। জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কোর এডুকেশন ফর অল গ্লোবাল মনিটরিং কর্মসূচির আওতায় প্রণীত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্ন আয় সত্ত্বেও অল্প যে কয়েকটি দেশ জাতীয় বাজেটে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে, বাংলাদেশ সেসব দেশের একটি। প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের শিক্ষার অগ্রগতি আরও জোরদার হবে বলেও তারা উল্লেখ করেছে।

সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম-শহর উভয় অঞ্চলেই বেড়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার হার। মানের দিক থেকেও এগিয়েছে এ পর্যায়ের শিক্ষা। উপবৃত্তির কারণে স্কুলগামী মেয়েশিশুর হার বেড়েছে। স্কুলে খাবার কর্মসূচিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এসব কর্মসূচির ফলে ঝরে পড়া শিশুর হার কমেছে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশের নারী এখন অন্যদের জন্য উদাহরণ। বিশ্বের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ যেখানে ৪৯ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশে মোট শিক্ষার্থীর ৫০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ৫২ শতাংশই ছাত্রী। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান রিপোর্টে দেশের শিক্ষার উন্নয়নের এই চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ক্রমেই কমছে। ২০০৫ সালে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার যেখানে ছিল ৮০ শতাংশেরও বেশি, সেখানে এই মুহূর্তে ঝরে পড়ার হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ২৮ শতাংশে।

বর্তমান সরকার `ভিশন-২০২১`-কে সামনে রেখে শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষ্যে সুশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য `শিক্ষাকে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার` বিবেচনায় নেয়। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদকে কো-চেয়ারম্যান করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি করে। কমিটি চার মাসের মধ্যেই একটি খসড়া শিক্ষানীতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। সর্বজনগ্রাহ্য একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য খসড়াটির ওপর ব্যাপক জনমত গ্রহণের লক্ষ্যে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও সভা-সমাবেশ, সেমিনার-ওয়ার্কশপ থেকে মতামত গ্রহণ করা হয়। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, অভিভাবক, রাজনীতিক, আলেম-ওলামা, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, পেশাজীবীসহ সমাজের নানা পর্যায়ের মানুষের মতামত, সুপারিশ ও পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে খসড়া শিক্ষানীতিকে আরো সংশোধন-সংযোজন করে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। `জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০` এর আলোকে দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যা শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণ এবং আগামী প্রজন্মকে দক্ষ, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উদ্ভাসিত এবং আলোকিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। বর্তমান সরকার প্রণীত শিক্ষানীতি অত্যন্ত আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক। এ শিক্ষানীতি অতীতের পশ্চাৎপদতা ও বিভ্রান্তি ঝেড়ে ফেলে যুগের চাহিদা পূরণে সক্ষম। এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে শিক্ষাক্ষেত্রে দেশ নতুন মাইলফলকে পৌঁছবে। বাংলাদেশে মূলধারা, মাদ্রাসা ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে ৭ কোটি তরুণ শিক্ষার্থীদের একটি সমন্বিত একক শিক্ষা পদ্ধতির আওতায় আনা সম্ভব হবে।

ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং ঝরে পড়া রোধের লক্ষ্যে ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ হতে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সকলস্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষাখাতে সবচেয়ে দুঃসাহসিক, যুগান্তকারী ও আশা জাগানিয়া বিশাল সফল কর্মযজ্ঞ হলো বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ। প্রতিবছর ১ জানুয়ারি প্রাথমিক, এবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি ছাত্রছাত্রীরা নতুন বই পাচ্ছে। পরপর পাঁচ বছর শিক্ষা শুরুর প্রথম ক্লাসেই সারাদেশে সব ছাত্রছাত্রীর হাতে বই পৌঁছে দেওয়া সরকারের সফলতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য আধুনিক ও সময়োপযোগী কারিকুলাম অনুসারে পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা হচ্ছে। ১৯৯৫ সালে প্রণীত কারিকুলামকে যুগোপযোগী করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নতুন কারিকুলামে ১১১টি নতুন বই লেখা হয়েছে এবং উক্ত নতুন বইসমূহ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরিসহ সকল ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। শিক্ষানীতির আলোকে কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে সরকার। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেসব বই পড়ানো হতো তা লেখা হয়েছে ১৯৯৫ সালে প্রণীত কারিকুলাম অনুসারে। এই সময় জ্ঞান-বিজ্ঞান বিশেষ করে প্রযুক্তির জগতে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটেছে। পাঠ্যবইয়ে এর প্রতিফলন ছিল না। সরকার কারিকুলাম যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়। প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক ২ বছর ধরে কাজ করে নতুন যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রস্তুত করে। তার ভিত্তিতে নতুন পাঠ্যবই প্রণয়ন করা হয়। কারিকুলাম যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে কারিকুলামের বৈশিষ্ট্য, নম্বর বিন্যাস, বিষয় সংযোজন-বিয়োজনসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, জীবনমুখী শিক্ষা, তথ্য প্রযুক্তি, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্ম ও জীবনভিত্তিক শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও খেলাধুলা, ক্যারিয়ার এডুকেশন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, চারু ও কারুকলা নতুন বিষয় হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। আগের ধর্ম বইয়ের পরিবর্তে এখন ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বই করা হয়েছে। বইয়ে ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। কর্ম ও জীবনভিত্তিক শিক্ষা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয় দু`টি ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে প্রবর্তন করা হচ্ছে। সমাজ বিষয়ে বইয়ের আধুনিক সংস্কার `বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়` নামে বই করা হয়েছে। ৮ম শ্রেণিতে ১০০ নম্বরের ১টি ঐচ্ছিক বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। বানানরীতিও একই পদ্ধতি অর্থাৎ বাংলা একাডেমির পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিকৃতি রোধে প্রথিতযশা ইতিহাসবিদদের নিয়ে সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংযোজন করেছে সরকার। বর্তমান প্রজন্ম স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় বীরদের সঠিকভাবে জানতে পারছে। সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা, জনগণের সংগ্রাম যা কিছু আড়াল করা হয়েছিল। তা পাঠ্যবইয়ে যথাযথভাবে স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের পাঠ্যপুস্তকেও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রণয়ন করা হয়েছে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি। এর ফলে বদলে গেছে সনাতন ধারার পাঠ ব্যবস্থাপনা। মুখস্ত করে বা নকল করে পাস করার দিন এখন আর নেই। এখন পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং প্রয়োগ করতে হবে। আর পারলেই নম্বর। একটুও কম নম্বর দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০১০ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় ২টি বিষয় বাংলা ও ধর্মে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ সালে এতে যুক্ত হয়েছে ৫টি বিষয়। ২০১২ সালে গণিত ও উচ্চতর গণিত বাদে ২১টি বিষয়ে এ পদ্ধতি চালু হয়েছে। দাখিলে ২০১১ সালে বাংলা ও ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি শুরু হয়। ২০১২ সালে নতুন ৩টি বিষয় যুক্ত হয়েছে। ২০১৩ সালে আরো ৩টি যুক্ত করা হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষায় ২০১২ সালে প্রথম বাংলা বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হয়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষার ভালো ফল ইতোমধ্যেই পাওয়া গেছে। ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে মান। শিক্ষার্থীদের যেকোনো বিষয় যৌক্তিকভাবে বোঝা ও উপস্থাপনের দক্ষতা বাড়ছে। ধীরে ধীরে দেশজুড়ে গড়ে উঠছে একটি শিক্ষিত যুক্তিনির্ভর প্রকৃত আধুনিক এক প্রজন্ম।

পরীক্ষার ক্ষেত্রেও পুরনো প্রথা ভেঙেছে সরকার। এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার জন্য আগাম প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে শিশু-কিশোররা। কারণ এসব পরীক্ষার আগেই একই ধরনের একাধিক পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাদের। সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ২০০৯ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়। ২০১০ সাল থেকে অষ্টম শ্রেণি শেষে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও মাদ্রাসায় জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা শুরু হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষা শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। আগে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে দু`টি পরীক্ষা নেওয়া হতো। একটি বৃত্তি পরীক্ষা ও আরেকটি বার্ষিক পরীক্ষা। এতে শুধু বাছাই করে বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের পড়ানো হতো, অন্যদের ছুটি। এখন একই পরীক্ষায় মেধাবীরা বৃত্তি পাচ্ছে এবং অন্যরা পরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে। সবার প্রতি সমান যতœ নেওয়া হচ্ছে। ক্লাস হচ্ছে সবার জন্য। সারাদেশে মান ও সক্ষমতা অর্জনে অগ্রগতি হচ্ছে। কমেছে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভীতি। আর এর সুফল মিলছে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের পরীক্ষায়। সেখানে অকৃতকার্যের সংখ্যা প্রতিবছরই কমছে।

ইতোমধ্যেই জেন্ডার সমতা অর্জন হয়েছে। বিনামূল্যে বই বিতরণ ও উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ছাত্রীদের ভর্তি হার বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে স্নাতকপর্যায়ে নারী শিক্ষার হার প্রায় ৫০ ভাগ। আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার হার প্রায় সমান সমান। শিক্ষাক্ষেত্রে জেন্ডার সমতায় ইতোমধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে লিঙ্গীয় অসমতা অনেক কমেছে। ২০ বছরের কম বয়সী পুরুষদের মধ্যে স্কুলে অংশগ্রহণের হার ৬৪ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৭ শতাংশ। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মেয়ে মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখন ছেলের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি। মেয়েদের ক্ষেত্রে নেট ভর্তির হার ৪৪ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ৩২ থেকে ৪৫ শতাংশ হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে নানামুখী পদক্ষেপের ফলে পাসের হার বাড়ছেই। প্রতিবছরই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ডের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, ঝরেপড়া রোধ করা, বাল্যবিবাহ রোধ করা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রসার, আর্থসামাজিক উন্নয়নে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার উপবৃত্তিসহ আর্থিক সহায়তা বাড়িয়েছে। বাড়ানো হয়েছে মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার ধাপ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৫টি প্রকল্পের আওতায় ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সেকেন্ডারি এডুকেশন স্টাইপেন্ড প্রজেক্ট (এসইএসপি) এবং মাধ্যমিক শিক্ষাখাত উন্নয়ন প্রকল্প (এসইএসডিপি) মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রীদের উপবৃত্তি (৪র্থ পর্ব) প্রকল্প এবং স্নাতক ও সমমানের উপবৃত্তি প্রকল্প চালু রয়েছে। সরকার এসব প্রকল্প থেকে ২০১৩ সালে ১ কোটি ২০ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থ বছর থেকে ২০১২-২০১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত সময়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার্থীসহ মোট প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থীকে ২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা উপবৃত্তিসহ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। মাধ্যমিক থেকে স্নাতক স্তর পর্যন্ত দেয়া এই বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পেরেছে। আর এ বৃত্তির মধ্যে ৭৫ শতাংশই দেয়া হয়েছে মেয়ে শিক্ষার্থীদের।

স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণে উপবৃত্তি প্রদানের লক্ষ্যে `প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট` নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে এবং এই ট্রাস্ট ফান্ডে সরকার ১ হাজার কোটি টাকা সিড মানি প্রদান করেছে। এই তহবিল থেকে এখন এক কোটি ২৮ লাখ শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ে ছাত্রীদের জন্য এ ফান্ড হতে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৬ ছাত্রীকে মোট ৭৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে কোনো শিক্ষার্থী দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না। এই তহবিল গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখতে এবং তাদের অভিভাবকদের বোঝা লাঘবে সহায়তা করছে।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পাল্টে দিয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের সকল পাঠ্যপুস্তক এখন ই-বুক আকারে পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ওয়েবসাইট ডায়নামিক করে, ই-বুক ভার্সন উন্নয়ন করে মাধ্যমিক স্তরের ৫০টি বাংলা ভার্সন, ২৬টি ইংরেজি ভার্সন ও প্রাথমিক স্তরের ৩৩টি পাঠ্যপুস্তক তাতে (www.nctb.gov.bd) আপলোড করা হয়েছে। এনসিটিবি ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এটুআই প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ১০৯টি পাঠ্যপুস্তকের ই-বুক ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ, যে কোনো সময় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সকল পাঠ্যপুস্তক ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। এই ই-বুক কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন সেটের মাধ্যমে সহজেই পড়া যাচ্ছে।

প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে এনে সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এখন প্রতিবছর ১ নভেম্বর জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষা শুরু হয়, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু করা হয় ১ এপ্রিল। এসব পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করা হয়েছে। পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ, ক্লাস শুরু প্রভৃতি একটি শৃঙ্খলা ও নিয়মের মধ্যে এসেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনলাইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলসহ শিক্ষক নিয়োগ ও নিবন্ধন পরীক্ষার ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করছে। মোবাইল ফোনের এসএমএস এবং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ই-মেইলের মাধ্যমেও এই ফল অতি দ্রুত প্রকাশ করা হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন অনলাইনে সম্পন্ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া মোবাইল ফোনের এসএমএসের মাধ্যমে অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

শিক্ষাব্যবস্থায় আইসিটির ব্যবহার দিনদিন বেড়েই চলছে। সরকার আইাসিটি ইন এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান (২০১২-২০২১) প্রস্তুত করেছে। এছাড়া ই-লার্নিং কার্যক্রম এগুচ্ছে দ্রুতগতিতে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর আওতায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট তৈরি করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি সম্পৃক্ত করে একটি দক্ষ ও যুযোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষার সকলস্তরকে সম্পৃক্ত করে `আইসিটি ইন এডুকেশন মাস্টার প্লান` প্রণয়ন করা হয়েছে। ডিজিটাল কনটেন্ট বিষয়ে ১৫শ` শিক্ষক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং শিক্ষা কর্মকর্তাকে ওরিয়েন্টেশন প্রদান করা হয়েছে। সারাদেশে `আইসিটি ফর অ্যাডুকেশন ইন সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল` প্রকল্পের মাধ্যমে ২০ হাজার ৫০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের আওতায় ১৮ হাজার ৫০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ, স্পিকার, ইন্টারনেট, মডেম ও প্রজেক্টর বিতরণ করা হয়েছে। ১৪টি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে, ৫টি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে, ১টি মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে এবং নেকটার-এর প্রায় ৪০০ জন শিক্ষক প্রশিক্ষককে ডিজিটাল কনটেন্ট ও মাল্টিমিডিয়া কাসরুম বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এটুআই ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় শিক্ষকদের তৈরি ডিজিটাল কন্টেন্ট শেয়ারিংয়ের জন্য শিক্ষা বাতায়ন নামে একটি কন্টেন্ট পোর্টাল তৈরি করা হয়েছে (www.teachers.gov.bd)।

বর্তমান সরকার এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১৭২টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করেছে। এ ছাড়া, ৩১০টি মডেল স্কুল, ৭০টি স্নাতকোত্তর কলেজ, ২০টি সরকারি বিদ্যালয় এবং ৩৫টি মডেল মাদ্রাসায় কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এমপিওভুক্তকরণ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন বদলে গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহ ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির চাপ কমানোর লক্ষ্যে সরকারি বালক-বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ডাবল শিফট চালু করা হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করা হয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতা দূরীকরণের লক্ষ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। এভাবে প্রাইমারী এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক সংকট দূর করায় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৪৪ সহকারী প্রধান শিক্ষক-সহকারী প্রধান শিক্ষিকাকে প্রধান শিক্ষক পদে ও সহকারী শিক্ষক-সহকারী শিক্ষিকাকে সহকারী প্রধান শিক্ষক-সহকারী প্রধান শিক্ষিকা পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে।

জেলা শিক্ষা অফিসারদের বেতন স্কেল সপ্তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় সারাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চারটি। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছিল না। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৫টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৩টি।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করে শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের `কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২` প্রণয়ন করা হয়েছে। আধুনিক ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেদক্ষ জনবল তৈরির জন্য দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে। `Skills Development Project ও Skill and Training Enhancement Project শীর্ষক দুটি প্রকল্প চলছে। সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডাবল শিফট চালু করা হয়েছে।

বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে ২০২১ সাল নাগাদ একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা। এটি করতে মাদ্রাসা শিক্ষাকেও উন্নত ও আধুনিকায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসায় ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন করে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে `ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ফর মাদ্রাসা এডুকেশন প্রকল্প`র আওতায় ১০০টি মাদ্রাসায় ভোকেশনাল শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে এবং সাধারণ শিক্ষার অনুরুপ মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান ও কম্পিউটার শাখা চালু করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো ৩১টি সিনিয়র মাদ্রাসায় ৪টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার ন্যায় মাদ্রাসা শিক্ষায় এবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষা, জেডিসি পরীক্ষা সারাদেশে একই সময়ে গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সময়ে ফল প্রকাশ করা হচ্ছে অনলাইনে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বা এর অধিভুক্ত অন্যান্য সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করা দাখিল ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য দেশে এই প্রথম ব্যাচেলর অব মাদ্রাসা এডুকেশন (বিএমএড) কোর্স চালু করা হয়েছে। এর পূর্বে ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর কোনো প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ ছিল না। গাজীপুরের বোর্ডবাজারস্থ বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বিএমটিটিআই) এক বছর মেয়াদি এ কোর্স পরিচালনা করবে। মাদ্রাসা শিক্ষায় বিদ্যমান সমস্যার সমাধান ও আধুনিকায়নে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষা পরিচালনার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর স্থাপন হচ্ছে। একটি স্বতন্ত্র মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। এর মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষা আরো গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আলেম-ওলামাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল দেশে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ইতোমধ্যেই একটি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। শেখ হসিনার সরকারের জাতীয় উন্নয়নের স্রোতধারায় কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষিত আলেমদের সম্পৃক্ত করে তাদের কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণের জন্য সরকারি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় সাফল্যের ধারাবাহিকতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত পরিসর থেকে ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উন্নয়নে প্রণীত হয়েছে `বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০`। এই আইনের আওতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিচালনা পর্যন্ত সার্বিক কার্যসূচি বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিটি বিদ্যালয় পর্যাপ্ত শ্রেণি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। ক্লাসরুমসমূহ শিশুবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলাদেশের সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থা ও ভাষা বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা সম্পাদনের জন্য ৩৮৯.৪৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে `বাংলাদেশের নৃ-ভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা` শীর্ষক একটি কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে প্রায় ২৭ লাখ স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় খাবার পাচ্ছে। এই কর্মসূচির কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দারিদ্র্যপীড়িত জনসংখ্যার সিংহভাগ শিশুদের নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। স্কুল ফিডিং কর্মসূচি তাই অধিক কার্যকর এখন প্রত্যক্ষ গ্রামের অবহেলিত শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা স্কুলে আসছে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে। স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শিশু শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার হার ও গুণগত মান বজায় রাখা, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করছে। সবার জন্য শিক্ষার (ইএফএ) লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশের সাফল্য অর্জনের দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে মনে করছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা-ইউনেস্কো।

বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তনের মাধ্যমে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন করে নতুন প্রজন্মকে আধুনিক মানসম্মত যুগোপযোগী শিক্ষা এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা, শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোগ , শৃংঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ভর্তি নীতিমালা বাস্তবায়ন, যথাসময়ে ক্লাসশুরু, নির্দিষ্ট দিনে পাবলিক পরীক্ষা গ্রহন, ৬০ দিনে ফল প্রকাশ, সৃজনশীল পদ্ধতি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, স্বচ্ছ গতিশীল শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আকৃষ্ট করে ঝরেপড়া বন্ধ করা ও শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। স্কুল ও মাদ্রাসায় সকল ধরণের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে যথাসময়ে বই পৌঁছে দিয়ে দেশবাসীকে বিস্মিত করেছে। এই অভূতপূর্ব সফলতা সমগ্র জাতির কাছে প্রশংসিত হয়েছে এবং বিশ্ব সমাজে পেয়েছে স্বীকৃতি ও মর্যাদা।



মন্তব্য