ঢাকা - অক্টোবর ১৮, ২০১৯ : ২ কার্তিক, ১৪২৬

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক
অক্টোবর ০৫, ২০১৯ ১১:৪৫
৫১ বার পঠিত

সরকারের কৃষি বান্ধব নীতি গ্রহণ এবং তা যথাযথ বাস্তবায়নের ফলে জমির সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে হেটে যাচ্ছে তারই একটি অভাবনীয় সাফল্য এটি। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে এদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত। কোন ষড়যন্ত্রই দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারেনি।

সরকারের কৃষি বান্ধব বাজেটের ফলে কৃষিতে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে সফল। মৌসুমী ফসল, ফল ও শাকসব্জি এখন সারা বছর পাওয়া যায়। কৃষকদের প্রশিক্ষণের ফলে এবারও বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন আর বাংলার মানুষ না খেয়ে মরে না। এমন কি চাল ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ। বাংলাদেশের আম এখন ইউরোপে রপ্তানী হচ্ছে। কৃষক ভাইদের জন্য সহজ কিস্তিতে কৃষিঋণ দেয়া হচ্ছে। ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেয়া হয়েছে। পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানী করে বাংলাদেশ ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বাংলাদেশের চা বিশ্বে জনপ্রিয় এবং চা উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ পর্যায়ে স্থান করে নিয়েছে।

খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান এখন দশম। এক ও দুই ফসলি জমি অঞ্চল বিশেষে প্রায় চার ফসলি জমিতে পরিণত করা হয়েছে এবং দেশে বর্তমানে ফসলের নিবিড়তা ১৯৪%। দক্ষিণ অঞ্চলে ভাসমান বেডে চাষাবাদ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। সরকার সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতে আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। ২০১৮ সালে সার খাতে ৫৮ হাজার ৯ শত ৪৫ কোটি টাকা আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে।

২০০৮-০৯ অর্থবছর হতে কৃষি প্রণোদনা/পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে ৮২৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৭৪ লাখ ৫৪ হাজার ৩১৩ জন কৃষক উপকৃত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া এবং বিভিন্ন ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করেছে। ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দেওয়ায় ১ কোটি ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৮টি ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব হয়েছে, যেখানে বর্তমান স্থিতি প্রায় ২ শত ৮২ কোটি টাকা।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। লবণাক্ততা, খরা, জলমগ্নতা সহনশীল ও জিংকসমৃদ্ধ, ধানসহ এ পর্যন্ত ধানের ১০৮টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। নিবিড় সবজি চাষের মাধ্যমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন সবজি উৎপাদন করে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম। দেশে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২.৮৮ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছে। কৃষি পণ্য রফতানি থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ শত ৭৩ দশমিক ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে।

২০০৮-০৯ অর্থবছরে ধান, গম, পাট, ভূট্টা, আলু, সবজি, তৈল ও মসলাসহ বিভিন্ন ফসলের গুণগত মানসম্মত বীজ সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৮ শত ৭৪ মে.টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৩ লক্ষ ২৯ হাজার ৯ শত ২২ মে.টনে। ২৮ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ১২টি আলুবীজ হিমাগার নির্মাণ এবং ৪টি টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ১৪ হাজার ৫ শত ২০ দশমিক ৪২ কোটি টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

বিগত ৯ বছরে মাছের উৎপাদন ২৭.০১ লাখ মেঃ টন থেকে বেড়ে ৪১.৩৪ লাখ মেঃ টন উন্নীত হয়েছে। মাংসের উৎপাদন ১০.৮০ লাখ মেঃ টন থেকে বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭১.৬০ লাখ মেঃ টনে উন্নীত হয়েছে। দুধের উৎপাদন ২২.৯ লাখ মেঃ টন থেকে বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৪.০৬ লাখ মেঃ টনে উন্নীত। ডিমের উৎপাদন ৪৬৯.৬১ কোটি থেকে বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫৫২ কোটিতে উন্নীত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র ৩.৬১ শতাংশ এবং মোট কৃষিজ আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে মৎস্য খাত হতে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন বরাদ্দ ১৬৪.০১ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭১২.০১ কোটি টাকায় উন্নীত।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৮,৩০৫.৬৮ মে.টন মৎস্য ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে ৪২৮৭.৬৪ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে, যা ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৩২৪৩.৪১ কোটি টাকা। ঐতিহাসিক সমুদ্রবিজয়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার জলসীমায় আইনগত একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন ২.৯৮ লক্ষ মে.টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫.০০ লক্ষ মে. টনে উন্নীত। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সামজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় জাটকা সমৃদ্ধ ১৭ জেলার জাতীয় ৮৫টি উপজেলায় জাটকা আহরণে বিরত থাকতে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৩জন জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ৪ মাসের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় মোট ৩৮,১৮৭.৬৮ মে. টন চাল প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৫৩৪টি মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন। কুচিয়ামাছ অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। কুচিয়া রপ্তানি করে ১৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত। ৬৩টি উপজেলায় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ লালনপালন, চিকিৎসা সেবাসহ যেকোন ধরনের সমস্যার জন্য যেকোন মোবাইল হতে ১৬৩৫৮ নম্বরে বিনামূল্যে এস.এম.এস এর মাধ্যমে পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে।

দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২০২১ সালের মধ্যে ৩০ লক্ষ মেট্রিক টনে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে ৬.৪০ লক্ষ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার আধুনিক খাদ্য গুদাম/সাইলো নির্মাণের লক্ষ্যে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে ১.১০ লক্ষ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের উত্তরাঞ্চলে মোট ১৪০টি গুদামসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। সারাদেশে ১০০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষম ৭০ টি গুদাম এবং ৫০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষম ১৩০টি গুদাম নির্মাণ।

মংলা বন্দরে ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন কনক্রিট গ্রেইন সাইলো, আনলোডার, সাইলো জেটি নির্মাণ, সাইলো ভবনসহ বিভিন্ন ধরনের কনভেয়িং সিস্টেম ও ওজন যন্ত্র স্থাপন। বগুড়া জেলার সান্তাহার সাইলো ক্যাম্পাসে বহুতল গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। সোলার প্লান্টসহ ২৫,০০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার মাল্টিস্টোরিড ওয়্যারহাউজ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত। ভিজিডি, ভিজিএফ, জিআর ইত্যাদি খাতে ২০১৬-১৭ অর্থ-বছরে ৮.৩৭ মেট্রিক টন পরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ। ভিজিডি খাতে পুষ্টি চাল বিতরণ; হাওর এলাকায় ১০০ দিন কর্মসূচিতে ১০ টাকা মূল্যে চাল বিতরণ ও ওএমএস কার্যক্রম গ্রহণ।

২০১৫ সালে শ্রীলংকায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন চাল রপ্তানি। ২০১৬ সালে নেপালে ২০ হাজার মেট্রিক টন চাল সাহায্য হিসেবে প্রেরণ। ২০১৬ সাল হতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫০ লক্ষ হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে প্রতি মাসে পরিবার প্রতি ৩০ কেজি করে প্রতি বছর ৫ মাস (সেপ্টেম্বর, নভেম্বর ও মার্চ-এপ্রিল) চাল ১০ টাকা কেজিতে বিতরণের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

দেশের প্রত্যেক মানুষ আজ তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারছে। কৃষকরা উদ্ভাবন ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা উভয়কেই সাদরে গ্রহণ করে ঢেলে সাজিয়েছে বাংলাদেশের কৃষিকে। তাতেই গতি সঞ্চারিত হয়েছে কৃষি অর্থনীতিতে। কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ায় চাষাবাদে এখন অল্প অর্থ ব্যয় করতে হয় কৃষকদের। সরকার কৃষকদের এত সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বিধায় এত ধান উৎপাদিত হয়েছে; যা অতীতে হয়নি। কাজেই কৃষক ও কৃষিকে রক্ষা করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধ পরিকর। আর তাই কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা হয়েছে। সুষম সেচ ও সার সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে চাষাবাদের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। কৃষি বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সাফল্য।



মন্তব্য