ঢাকা - জানুয়ারি ২৭, ২০২০ : ১৩ মাঘ, ১৪২৬

এরশাদের যত প্রেম

নিউজ ডেস্ক
জুলাই ১৭, ২০১৯ ০৮:৫৫
১৯১৭ বার পঠিত

ব্যক্তিজীবনে ভীষণ রোমাঞ্চ প্রিয় ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একাধিক প্রেম ও বিয়ের খবর শোনা গেছে। বিভিন্ন নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল আলোচনায়। এ নিয়ে এরশাদের ভাষ্য ছিল, তিনি নারীদের কাছে যান না; নারীরাই তার কাছে আসেন। তার মৃত্যুর পর আবারও আলোচনা আসছেন এই নায়ক । তার মৃত্যুর পর একটি বেসরকারি টেলিভিশন আর্কাইভ থেকে তার সাক্ষাতকার প্রকাশ করেন এখানে তিনি তার কলেজ জীবনের প্রেমের স্মৃতি বর্ণনা করেন।

এরশাদ বলেন আমি যখন কলেজে পড়ি। সেই কলেজে শেফালী সরকার নামের একটি মেয়ে পড়তো। মেয়েটি দেখতে তেমন সুন্দর ছিলো না। কিন্তু অনেক আকর্ষণীয় ছিলো। কলেজের সবাই তাকে ভালোবাসতে চাইতো। আমারও ভালোলাগতো। একদিন কে বা কারা কলেজের ছাদে ইটের খোয়া দিয়ে লিখে লেখেছিলো শেফালী তুমি সবার উপর। সেই দিন থেকে শেফারি উপরে তারও কিছু প্রেম তৈরি হয়। গোপনে গোপনে তিনিও প্রেমে পড়ে। এমনকি তাকে নিয়েও কবিতা লেখেন তিনি।

শুধু তাই নয় এরশাদ চারজনকে বিয়ে করেছিলেন বলে খবর পাওয়া যায়। তারা হলেন রওশন, বিদিশা, মেরি ও জিনাত মোশাররফ। এর মধ্যে দুজনের বিয়ের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। একজন রওশন এরশাদ। রওশনের আগে এরশাদের আরেকটি বিয়ের কথা আলোচনায় ছিল অনেক দিন। পরে কবিকন্যা বিদিশাকে বিয়ে করার বিষয়টিও ছিল আলোচিত ঘটনা। তাদের এই বিয়ে টেকেনি। তবে বিদিশার ঘরে জন্ম নেওয়া এরিক ছিল এরশাদের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। এরশাদের ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, জীবন সায়াহ্নে সাবেক সেনাশাসকের ভাবনা ছিল শুধু এরিককে নিয়ে। বিদিশার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রওশনই ছিলেন এরশাদের স্ত্রী।

তবে দীর্ঘদিন ধরে (জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত) দুজন দুই বাসায় থাকতেন। একান্ত প্রয়োজন বা রাজনৈতিক যোগাযোগ ছাড়া তাদের মধ্যে তেমন কোনো আলাপচারিতা ছিল না। এমনকি মৃত্যুর আগে এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতাল ও বাড়িতে থাকলেও রওশন তাকে দেখতে যাননি। অবস্থা সংকটাপন্ন হলে মৃত্যুর আগে তিন দিন এরশাদকে দেখতে হাসপাতালে যান রওশন। এরশাদ-রওশন দম্পতির এক সন্তান শাদ। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক নারীকে বিয়ে করে তিনি বসবাস করছেন মালয়েশিয়ায়।

মরিয়ম মমতাজ মেরি : এরশাদ আশির দশকে মেরি নামের এক নারীকে গোপনে বিয়ে করেছিলেন বলে শোনা যায়। যদিও মেরিকে জনসমক্ষে খুব কমই দেখা গেছে। এরশাদ নিজে কখনো এই বিয়ের কথা স্বীকারও করেননি। মরিয়ম মমতাজ মেরি যৌবনে ছিলেন-আকর্ষণীয় ফিগারের। সুঠামদেহী এই নারী ছিলেন প্রথম দর্শনেই সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার মতো সুন্দরী। স্বৈরাচারী শাসক সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদও প্রথম দর্শনে মেরির প্রেমে পড়ে কুপোকাত হন। মেরির দাবি অনুযায়ী এরশাদ তাঁর প্রেমে পড়ে অবশেষে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তবে এরশাদ মেরিকে বিয়ে করার কথা বরাবর অস্বীকার করলেও তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার বিষয়টি গোপন থাকেনি। মরিয়ম মমতাজ মেরির সঙ্গে এরশাদের প্রেম পরিণয়ে চটকদার খবর এক সময় চাউর থাকত সংবাদপত্রের পাতায়। ১৯৮৬ সালে খবর রটে এরশাদ মেরিকে বিয়ে করেছেন। এর পর থেকে আর কখনো মেরিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কথিত আছে, এরশাদ সে সময় বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিষয়টি চুকিয়ে নিয়ে মেরিকে লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে এক সন্তানের জননী মেরির লন্ডনে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।

এরশাদের অনেক বান্ধবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে জিনাত মোশাররফের নাম। ক্ষমতায় থাকাকালে জিনাতের সঙ্গে এরশাদের প্রেমের গল্প ছিল মুখে মুখে। এমনও শোনা যায়, তার নামের সঙ্গে মিল রেখে জিনাত মোশাররফ নতুন নামকরণ করেছিলেন জিনাত হুসেইন। এই প্রেম নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন এরশাদ। এতে ঘর ভাঙে জিনাতের। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় সাবেক মন্ত্রী মোশাররফের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করলে এরশাদের ইচ্ছায় সংরক্ষিত আসনে মহিলা সংসদ সদস্য হন জিনাত। জাতীয় পার্টির এক নেতা জানান, জিনাত মোশাররফ বর্তমানে স্থায়ীভাবে লন্ডনে বসবাস করছেন। পরে আর এরশাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না তার।

এরপর নিজ বয়সী কবি আবু বকরের মেয়ে বিদিশা ইসলামের প্রেমে পড়েন এরশাদ। প্রায় ৬ বছরের জেলজীবনে বিদিশার সঙ্গে প্রেম করে ২০০০ সালে এরশাদ ঘোষণা দেন, তিনি তাকে বিয়ে করেছেন। বিদিশাকে নিয়ে স্বল্পস্থায়ী সংসারে এরশাদের জটিলতা না কমে বরং বাড়তে থাকে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিদিশা চুরির মামলায় জেলে যান। চুকে যায় তখনকার মতো এরশাদ-বিদিশা পর্ব। বিদিশা-এরশাদের সন্তান এরিক এরশাদ বেঁচে থাকতে ঢাকাতেই বাবা-মার সঙ্গে ভাগাভাগি করে থাকত। মাসের বেশিরভাগ সময় বাবার সঙ্গেই বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে থাকত। মৃত্যুর আগে এরশাদ ট্রাস্ট করে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ওই ট্রাস্টকে দিয়ে যান। সেই ট্রাস্টে এরিককেও রেখেছেন তিনি। বিদিশা এখন স্থায়ীভাবে ঢাকাতেই আছেন। রাজনীতি না করলেও এরশাদের জাপার বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। এমনকি এরশাদের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও রাখতেন বিদিশা। এরশাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগে বিদিশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন বলে খবর পাওয়া যায়। এমনকি এরশাদের শেষ জীবনে বিদিশা জাতীয় পার্টিতে যুক্ত হতে চান বলেও ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

শেষ জীবনে খুব নিঃসঙ্গ সময় কেটেছে এরশাদের। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে আলাদা বাস করতেন এরশাদ ও রওশন। রওশন এরশাদ গুলশানে আর এরশাদ থাকতেন বারিধারার দূতাবাস রোডের ১০ নম্বর প্রেসিডেন্ট পার্কে। বিদিশার সঙ্গে বিয়ের পর এরশাদ গুলশানের বাসা ছেড়ে প্রেসিডেন্ট পার্কে চলে যান। বিদিশার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও এরশাদ ও রওশন এক ছাদের নিচে আসেননি। এরশাদকে পেয়ারা নাম দিয়েছিলেন রওশন । পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি বিয়ের পর দূরে থাকা স্ত্রীকে প্রচুর চিঠি লিখতেন। চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে সম্বোধন করতেন ‘হৃদয়ের রানী’ ‘হৃদয়ের ধন’ ‘ওগো মোর জীবন সাথী’ ‘খুশি বউ’ ‘খুশি পাগলী’ ‘সোনা বউ’ ‘খুকু বউ’ ‘ওগো দুষ্টু মেয়ে’ ‘নটি গার্ল’ ‘বিরহিনী’ ইত্যাদি অবিধায়। স্ত্রীর ডাকনাম ডেইজী হওয়ায় ভালবেসে ডাকতেন ডেজু, ডেজুমনি, ডেজুরানী। চিঠির শেষে নিজের পরিচয় লিখতেন ‘পেয়ারা পাগল সাথী’ ‘বড্ড একাকী একজন’ ‘প্রেম-পূজারি’ ‘বিরহী’ ইত্যাদি। ৬২ বছরের সংসার জীবন। স্ত্রীকে নিয়ে বিশ্বের বহুদেশ ঘুরেছেন। ৯ বছর দেশ শাসন করেছেন। স্ত্রীকে রাজনীতিতে এনে এমপি, মন্ত্রী এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতাও বানিয়েছেন।

এরশাদের ডাক নাম পেয়ারা ও রওশনের ডাক নাম ডেইজি। ১৯৫৬ সালে বিয়ের পর সেনা কর্মকর্তা স্বামী এরশাদকে চাকরিতে এখানে সেখানে থাকতে হয়। আর পড়াশুনার জন্য স্ত্রী রওশন এরশাদ ডেইজিকে এক বছর থাকতে হয় বাবার বাড়ি ময়মনসিংহে। তখন এইচ এম এরশাদ দূরে থাকা স্ত্রীর বিরহে লেখা চিঠিতে এই শব্দগুলো ব্যবহার করতেন। এরশাদ নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, বিয়ের পর সংসার করার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। রওশন ওদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছিল। চাকরির জন্য আমি আজ এখানে কাল ওখানে। সে সময় দূরে থাকা স্বামীরা স্ত্রীদের কাছে চিঠি পাঠাতো। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। বহু চিঠি লিখেছি; চিঠির প্রথমে রওশনকে অনেকভাবে ‘সম্বোধন’ করতাম।



মন্তব্য