ঢাকা - জুলাই ২৩, ২০১৯ : ৮ শ্রাবণ, ১৪২৬

বসনীয়দের অনন্ত বেদনার উৎস স্রেব্রেনিসা

নিউজ ডেস্ক
জুলাই ১২, ২০১৯ ১০:৪০
৭২ বার পঠিত

গতকাল ১১ জুলাই ছিল স্রেব্রেনিসা গণহত্যার ২৪তমবার্ষিকী। প্রতি বছর সংবাদ সংস্থাগুলো বসনিয়ার একটি ছোট্ট শহর স্রেব্রেনিসার গণহত্যার শিকারদের জন্য নিখাদ শোক প্রকাশের খবর প্রকাশ করে। একই ধরনের ছবি নেন ফটোগ্রাফাররা। সাদা স্কার্ফে মাথা ঢাকা নারী ও মাথায় সাদা টুপি পরা পুরুষদের প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। ২৪ বছর আগে স্রেব্রেনিসায় গণহত্যা ঘটেছে, কিন্তু বসনীয়দের জন্য প্রতি বছর এটি অনন্ত বেদনার উৎস হয়ে ফিরে আসে। এ বছর গণহত্যার ২৪তমবার্ষিকী স্মরণ করেছে অনেক বসনিয়ান। গণহত্যা চলাকালে অনেক অজ্ঞাত লাশে পূর্ণ কবরস্থানগুলোতে আবারো প্রার্থনা হয়েছে এবং বিষণœতা নিয়ে শোকাহতরা একত্র হয়েছে।

১৯৯২ সালে যখন বালকানদের যুদ্ধ শুরু হয়, তখন সার্বিয়ান বাহিনী ঘিরে রেখেছিল স্রেব্রেনিসা নামক ছোট শহরটি। অবরোধের ফলে খাদ্য ও ওষুধসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের বিভিন্ন পণ্য-দ্রব্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। বসনীয়দের বেশির ভাগই নিরস্ত্র ছিল, সার্বিয়ানদের অপছন্দ করত ও সংগঠিত ছিল না। জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করেছিল। তারা আশপাশের শহর থেকে উদ্বাস্তুদের স্বাগত জানাতে যথেষ্ট উদার ছিল কারণ সার্বিয়ান বাহিনী ইতোমধ্যে তাদের পরাস্ত করেছিল। খাদ্য, জ্বালানি ও পানির অভাব সত্ত্বেও আটকা পড়ে থাকা লোকেরা তাদের জীবন বাঁচায়ে রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। বসনিয়রা জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনের সৈন্যদের দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। কিন্তু এই সুরক্ষাটি ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে শেষ হয়। জাতিসঙ্ঘের সৈন্যরা বের হওয়ার সাথে সাথেই গণহত্যা শুরু হয়। সার্বিয়ান বাহিনী যখন শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল তখন পুরো শহর ভীত ছিল।

সার্বিয়ান বাহিনী বসনিয়দের কেবল হত্যাই করেনি বরং নির্যাতন ও ধর্ষণ করেছিল। বেঁচে থাকা অনেক লোক স্মৃতিচারণ করে যে সার্বিয়ান আধা-সামরিক গোষ্ঠী ধীরে ধীরে মানুষকে হত্যা করেছিল, তারপর তাদের টুকরো টুকরো করে চারপাশে ছিটিয়ে দিয়েছিল। অতএব কিছু লাশের শরীরের অংশ পাওয়া যায়নি এবং কবরস্থানে রাখা হয়নি। মহিলাদের নির্দিষ্ট বাড়িতে জড়ো করা হতো এবং বারবার ধর্ষণ করা হতো। কিছু নারীকে ইচ্ছাকৃতভাবেই হত্যা করা হয়নি যাতে তারা সার্বিয়ান সৈন্যদের সন্তানদের তাদের গর্ভে জন্ম দিতে পারে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও বসনীয়দের যন্ত্রণা শেষ হয়নি, কারণ বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাগুলো খুবই ভঙ্গুর। বসনিয়া একটি দেশ হলেও প্রেসিডেন্ট তিনজন! মাত্র সাড়ে ৩৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটি বিভাজিত তিনটি বৃহৎ জাতিসত্তায় বসনীয়ান, সার্ব ও ক্রোয়েট। তিন প্রেসিডেন্ট আসলে এই তিন জাতিসত্তারই প্রতিনিধি। এমন জাতিবিভাজনের জন্য দেশটির ভৌগোলিকতাও নানা জটিলতায় মোড়া। আর জাতিবিরোধ এড়াতেই অভিনব পন্থায় দেশটি সাজিয়েছে নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে। যার দরুন দেশটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেশে।

এই গণহত্যা চালানোর সময় বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো ভয়ঙ্কর এই দৃশ্যগুলো দেখার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল। বসনীয়ানদের নৃশংসভাবে নির্মমভাবে নিপীড়িত করার পর আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো চলমান যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং সার্বিয়ান বাহিনীকে থামায়ে ছিল। হাজার হাজার হত্যার পর আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষমতাধর জাতিগুলো সার্বিয়ান নেতাদের থামাতে চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের আটক করে কারাগারে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এখন কাউন্সিল অব ইউরোপও গণহত্যা স্মরণ করছে। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে তুরস্কের সাহায্যে স্মৃতিচারণ চলছে। তাছাড়া হাজার হাজার নির্দোষ মানুষকে গণহত্যার স্মৃতিচারণায় যোগদানকারী কয়েকজন নেতার মধ্যে আছেন প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ ও আলজাজিরা।



মন্তব্য