ঢাকা - আগস্ট ২১, ২০১৯ : ৫ ভাদ্র, ১৪২৬

নিজ দেশে ফেরার স্বপ্নপূরণ হোক শরণার্থী বানার

নিউজ ডেস্ক
জুন ০২, ২০১৯ ১১:৪৬
১০৭ বার পঠিত

আনিসুর রহমান এরশাদ

‘আলেপ্পো একটি ভালো শহর, কিন্তু আমরা শান্তি চাই। আমি একটি শিশুর মতো নিরাপদে বাঁচতে চাই কিন্তু তার পরিবর্তে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। আমি বাইরে যেতে পারি না বোমার কারণে। দয়া করে আমাদের উপর বোমা নিক্ষেপ বন্ধ করো’। নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে যুদ্ধ বিরোধী এরকম কথা বলে সারাবিশ্বে বেশ পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন সিরিয়ায় বিদ্রোহী শাসিত আলেপ্পো অঞ্চলের ‘আলেপ্পোর টুইটার বালিকা নামে খ্যাত ৯ বছর-বয়সী বানা আল-আবেদ। তিনি বাশার আল আসাদের শাসনের অধীনে ভোক্তভূগী নাগরিকদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের ইদলিবের খান শাইখুন শহরে জনসাধারণের উপর রাসায়নিক হামলার জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে যখন আসাদ সরকারের শাইরাত এয়ারবেইসে ক্রুস মিসাইল হামলা চালিয়েছিল, সে হামলাকে সমর্থন জানিয়ে ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল বানা একটি টুইট করেন। একটি টুইটে বানা উল্লেখ করেছিলো, ‘রাশিয়া এবং আসাদকে আলেপ্পোতে গণহত্যা চালাতে দেওয়ার পরিবর্তে ৩য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া ঢের শ্রেয়।’পরবর্তীতে টুইটটি মুছে ফেলা হয়। এছাড়া বানা তুরস্কের টিভি চ্যানেলগুলোতে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলো, যেখানে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, তার পছন্দের খাবার কোনটি এবং প্রত্যুত্তরে বানা না বুঝে জবাব দিয়েছিল ‘সিরিয়ার শিশুদের রক্ষা কর’।

‘মি: ডোনাল্ড ট্রাম্প, আপনাকে কি কখনো খাবার বা পানি ছাড়া ২৪ ঘণ্টা ক্ষুধার্ত পেটে থাকতে হয়েছে? শুধু একবার সিরিয়ার শরণার্থী ও শিশুদের কথা ভেবে দেখুনতো’- ২রা ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫২ মিনিটে তার টুইটারে নতুন টুইটটি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ এই প্রশ্ন করেছে বানা। এর আগে বানা মি: ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে এক খোলা চিঠিতে লিখেছিল ‘সিরিয়ার শিশুদের জন্য আপনাকে কিছু করতেই হবে। কারণ তারা আপনার সন্তানদের মতোই। তারাও আপনার মতো শান্তিতে থাকার অধিকার রাখে’। সিরিয়াসহ সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের প্রতিক্রিয়ায় টুইটারে বানা লিখেছিল, ‘প্রিয় ট্রাম্প শরণার্থীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আর এটি যদি ভালো সিদ্ধান্তই হয় তাহলে আপনার জন্য আমার পরামর্শ হলো অন্য দেশগুলোতে শান্তি স্থাপন করুন’।

ট্রাম্প নিজের যুক্তি তুলে ধরে টুইটারে বলেছিলেন ‘খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসা খারাপ লোকদের নিজের দেশের বাইরে রাখাই আমার উদ্দেশ্য’। এরও প্রতিক্রিয়ায় ২০১৭ সালের ১লা ফেব্রুয়াারি বানার টুইটারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্ট শেয়ার করে লেখেন- ‘আমি কি সন্ত্রাসী?’

চলমান গৃহযুদ্ধের ফলে প্রাপ্তবয়স্করা বেশ ব্যস্ত, বিধ্বস্ত হয়ে গেছে জনপদ। এমতাবস্থায় যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে তার দেশের শিশুদের এবং সারা বিশ্বের শিশুদের বাঁচানোর জন্য ‘জরুরি ব্যবস্থা’ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন বানা। আনাদোলু এজেন্সির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বানা বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সিরিয়ায় আমার জীবন ভালোভাবে কাটছিল। এটা খুবই শান্তিপূর্ণ ছিল; আমি পরিবারের সাথে অনেক আনন্দে ছিলাম। যুদ্ধ শুরু হলে সবকিছু বদলে গেল। আমি ভীত ছিলাম যে, আমি অথবা আমার পরিবারের অন্য কোনো সদস্য মারা যাবে। আমার বন্ধু ইয়াসমিনকে মেরে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু আমি আশা হারাইনি। আলেপ্পোতে অবরোধের সময় কোনো খাবার বা পানি না থাকার কথা আমি ভুলতে পারিনি।’

বানা বলেন, ‘ সারা বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে অভিবাসী শিশুরা রয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়াতে বোমা হামলা ও সংঘর্ষের ফলে অনেক শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদেরেকে তাদের দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতে হবে, যাতে শরণার্থী শিশুরা তাদের বাড়িতে ফিরে আসতে পারে। আমি এই পৃথিবীকে আরো ভালো জায়গা হিসেবে গড়ার স্বপ্ন দেখি। আমি অনেক কিছুই পরিবর্তন হবে বলে আশা করি’।

আলেপ্পো থেকে তুরস্কে গমণের যাত্রা সম্পর্কে বানা বলেন: ‘এটা এত কঠিন ছিল যে, আমি মনে করতে পারি বাস্তুচ্যুত শিশুরা বাসে কাঁদতে ছিল।’ তিনি তুরস্কে পৌঁছানোর পরের প্রথম ঘন্টা স্মরণ করে বলেন, ‘দুইদিনের বাস যাত্রার পর আমি ও অন্যান্য শিশুরা ছিলাম অত্যন্ত ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। পরের দিন আমরা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের সাথে দেখা করি। আমি একই সময়ে সবাইকে খুশি, উত্তেজিত ও ভীত পেয়েছি’।

বানা বলেছিলেন, ‘আমি নিজেকে বলেছিলাম সিরিয়ার শিশুদের কাছ থেকে আমার বার্তা প্রদান করার সময় আমাকে শান্ত থাকতে হবে, যাতে সব জায়গায় শিশুকে শান্তিতে থাকতে দেয়া হয়।’ তুরস্কের নতুন জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বানা জ্বলজ্বল চোখে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি তুরস্ককে অনেক ভালবাসি; এটি নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ। এখানে আমার স্কুল এবং অনেক বন্ধু রয়েছে। আমি এখন তুর্কি নাগরিক হতে পেরে খুশি’। যাহোক তুরস্কে সুখী থাকা সত্ত্বেও বানা এখনো একদিন তার জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বানা বলেন, ‘আমি সবসময় আমার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। খুব শীঘ্রই বা দেরীতে হলেও আমরা দেশে ফিরে যাব।’

আলআবেদবানা নামের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে তার অ্যাকাউন্টটি মূলত তার মা ফাতেমাই পরিচালনা করে এবং নিজের শহর আলেপ্পোর যুদ্ধ নিয়ে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে। সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে তার অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা কিছু ছবি বেশ লাইক ও শেয়ার হয়েছে। তার বেশিরভাগ টুইটেই বিমান হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ, ক্ষুধা, জনসাধারণের উৎখাত, তার এবং তার পরিবারের মৃত্যু সম্ভাবনা, সুন্দর শৈশবের জন্য তার স্পৃহা, আলেপ্পোর আল-বাব বিভাগ এবং সর্বোপরি জনসাধারণের উদ্দেশ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো মানবিক দিকগুলো ফুটে উঠেছে। বানার একাউন্ট @AlabedBana তৈরি করা হয়েছিল ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখে। একাউন্ট খোলার ২ দিনেই ৭ বছর বয়সী বানা #HolocaustAleppo, #MassacreInAleppo, #StopAleppoMassacre এর মতো হ্যাশট্যাগ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে উল্লেখ করে টুইট করেন। টুইটার পরবর্তীতে তার একাউন্টে স্বীকৃতি প্রদান করে। এখন পর্যন্ত ১০৩৩টি টুইট করেছেন। বানার একাউন্টে প্রায় ৩,২৪,২৬৭ এর মতো অনুসারী রয়েছে। ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর বানার টুইটার একাউন্ট বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু পরবর্তীতে ২ দিনের মধ্যে সে তার একাউন্ট ফিরে পায় এবং তখন থেকে তার টুইট প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

যুদ্ধের পূর্বে বানার মা ফাতেমা একজন ইংরেজী ভাষার শিক্ষিকা ছিলেন। বানা আল-আবেদও তার মায়ের মতো শিক্ষিকা হতে চায় কিন্তু যুদ্ধের কারণে বানার স্কুল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বানার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। বানা তার মা ও ইংরেজি শিক্ষকের কাছ থেকে ইংরেজি বলা শিখেছেন। তার শহরে হ্যারি পটারের বই না পাওয়ার আক্ষেপে একটি টুইট করার পর জে কে রাউলিং নভেম্বর মাসে তার জন্য হ্যারি পটারের একটি ই-বুক সংস্করণ উপহার হিসেবে প্রদান করে। সেই মাসেই এক বিমান হামলায় তার পরিবারের ঘর ধ্বংস হয়ে যায় কিন্তু তার পরিবার সেই সময় এটি নিশ্চিত করেছিলো যে, শুধু সামান্য আঘাত ছাড়া তারা ঐ হামলায় বেঁচে ফিরেছিলো। বানার পিতা একজন উকিল ছিলেন যিনি দক্ষিণ-পূর্ব আলেপ্পোর স্থানীয় পরিষদে কাজ করতেন। বানার নূর এবং মোহাম্মদ নামের দুইজন ছোট ভাই আছে।

সিরিয়ার সরকার বাহিনী কর্তৃক আলেপ্পোতে সফলভাবে হামলা চালানোর পর তুরস্ক এবং রাশিয়ার মধ্যস্থতায় উক্ত শহর থেকে বিদ্রোহী এবং জনসাধারণদের খালি করার জন্য যুদ্ধবিরতি হয়। যখন আলেপ্পো শহরে জনসাধারণদের সরিয়ে আনার কর্মকান্ড পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করছিলো না, তখন বানার মা ফাতেমা তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু উল্লেখ করে একটি টুইট করেন এবং প্রত্যুত্তরে মন্ত্রী তাদের এবং বাকি জনসাধারণদের বের করে আনার তুরস্কের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। ২০১৬ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর সংবাদ মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হয়েছিলো যে, সিরিয়ার সরকার বাহিনীর আলেপ্পো দখলের পর ৩৫০ জন জনসাধারণ সমেত বানা আল-আবেদ এবং তার পরিবার যুদ্ধ কবলিত আলেপ্পো থেকে ফিরে আসতে পেরেছে। ২১ শে ডিসেম্বর বানা এবং তার পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্কে বসবাসের অনুমতি লাভ করে এবং আন্তর্জাতিক প্রেসের উপস্থিতিতে বানা এবং তার পরিবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ লাভ করে। ২০১৭ সালের ১২ই মে প্রেসিডেন্ট এরদোগান কর্তৃক তার পরিবার তুরস্কের নাগরিকত্ব লাভ করে। এখন তারা তুরস্কের প্রেসিডেন্টের প্রাসাদেই বসবাস করছে।



মন্তব্য