ঢাকা - সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ : ২ আশ্বিন, ১৪২৬

ভয়াবহ আসক্তি হয়ে উঠেছে ইয়াবা

নিউজ ডেস্ক
এপ্রিল ২৬, ২০১৯ ১১:৩৯
৩১৩ বার পঠিত

বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে- যে দ্রব্যটি তৈরি হয় মেথাম্ফেটামিন এবং ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে। লাল বা গোলাপি রঙের ট্যাবলেট আকারের এই মাদকটি খুব সস্তায় বিক্রি হয়। কর্তৃপক্ষও এটি দমন করতে শক্ত পন্থা বেছে নিয়েছে, যেখানে অনেক ব্যক্তিকে তথাকথিত 'ক্রসফায়ারের' নামে হত্যা করা হয়েছে।

''আমি একাধারে সাত, আট বা দশ দিন পর্যন্ত জেগে থাকতে পারি। আমি সকালে ইয়াবা নেই, দুপুরে একবার নেই, আবার বিকালে, এরপর মধ্যরাতে একবার নেই। ফলে না ঘুমিয়ে আমি সারারাত কাটিয়ে দিতে পারি।''

মোহাম্মদ একজন ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তি। একাধারে কয়েকদিন জেগে থাকার পর তিনি শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে পড়েন।

''আমার মাথা একেবারে খালি হয়ে যায়, আমি যেন একেবারে ভেঙ্গে পড়ি। দুইদিন বা তিনদিন পরে আমি জেগে উঠে একটু খাই, তারপর আবার বিছানায় চলে যাই। তখন যদি আমার কাছে ইয়াবার একটা টুকরোও থাকে, আমি সেটাকে আবার নিতে চাই।''

ঢাকায় কাজ করার সময় মোহম্মদের ইয়াবা খাওয়ার অভ্যাস শুরু হয়।

''আমাদের মূল ব্যবসা হতো জাপানের সঙ্গে, সুতরাং সময় পার্থক্যের কারণে আমাদের রাত জেগে কাজ করতে হতো। আমার একজন সহকর্মী ইয়াবার কথা বলেন। তিনি বলেন, যদি আমি এটা নেই, তাহলে তা আমাকে জেগে থাকতে সাহায্য করবে আর আরো উদ্যমী করে তুলবে।''

প্রথমে তার সহকর্মীর পরামর্শ মতোই সুবিধা পেতে শুরু করেন মোহাম্মদ। কিন্তু তা ছিল খুবই স্বল্পস্থায়ী। তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে নিজেকে ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থায় চলে যান।

''প্রথম দিকে ইয়াবার অনেক ইতিবাচক সুবিধা পাওয় যায়, এটি খেলে অনেক কিছুর সুবিধা বেড়ে যায়,'' বলছেন ড. আশিক সেলিম, মাদকাসক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন মনোরোগবিদ।

''আপনি সামাজিকভাবে অনেক সক্রিয় হয়ে উঠবেন......গান পছন্দ করবেন, সিগারেট এবং যৌনতাও। বাংলাদেশে যৌনতার সঙ্গে ইয়াবার একটি অস্বাস্থ্যকর সংমিশ্রণ ঘটানো হয়-আপনি অনেকক্ষণ জেগে থাকতে পারবেন, বেশি শক্তি থাকবে।''

''আপনি যদি ইয়াবা নেয়া বন্ধ করে দেন, তাহলে হয়তো মদ বা হেরোইনের মতো কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাবে না, কিন্তু এটা এমন এটি মাদক যার ওপর আপনি নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। এটাই হচ্ছে এই মাদকের সবচেয়ে বিপদজনক দিক।''

বাংলাদেশে ২০০২ সালে প্রথম ইয়াবার ব্যবহার শুরু হয়, এরপর থেকে তা বাড়ছেই। মিয়ানমারে তৈরি হওয়া এই মাদকদ্রব্যটি দেশের দক্ষিণ পূর্বের নাফ নদী পার হয়ে চোরাচালান হয়ে বাংলাদেশে আসে।

এই নদীর তীর জুড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর এসে আশ্রয় নিয়েছে। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসব ক্যাম্পে বসবাস করছে- যাদের অনেককে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়েছে মাদক কারবারিরা।

এদের মধ্যে নারীরাও রয়েছে, যারা এমনকি যৌনাঙ্গের ভেতর ভরে ইয়াবা চোরাচালান করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে অপার সম্ভাবনাময় একটি ব্যবসা দেখতে পেয়েছেন মাদক কারবারিরা। বিশ্বের দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল অর্থনীতির একটি দেশ বাংলাদেশ- সুতরাং এখানে অনেক বেশি ইয়াবা চোরাচালান করে এবং সস্তায় বিক্রি করে একটি বাজার তৈরি করেছে। অর্থনীতি যতই সমৃদ্ধ হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন সেই সঙ্গে ইয়াবার ব্যবহারও দিনে দিনে বাড়ছে।

''আমি এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম,'' বলছেন মোহাম্মদ।

তার স্ত্রী নুসরাত তখন সদ্য মা হয়েছেন। তিনি বলছেন, সে সময় মোহাম্মদের আচরণ সম্পর্কে কোন ধারণা করা যাচ্ছিল না।

''সে বাড়িতে এসে সবকিছুর জন্য আমাকে দায়ী করতে লাগলো, এমনকি খাবার, বন্ধু, আমার চাকরি..সবকিছুর জন্য। এটা ছিল খুবই অস্বাভাবিক, এটা তার সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না।'' বলছেন নুসরাত।

একদিন তিনি বাড়িতে বেশ কয়েকটি ইয়াবা ট্যাবলেট খুঁজে পান। এ নিয়ে তিনি মোহাম্মদকে প্রশ্ন করেন।

''সে আমার সঙ্গে চিৎকার করে। সে যেন চিকিৎসা নিতে রাজি হয় সেই চেষ্টা করেছিলাম আমি, কিন্তু সে রাজি হয়নি। আমার মনে হচ্ছিল, সে যে কোন কিছুই করে ফেলতে পারে, সে আমাদের হত্যাও করে ফেলতে পারে।'' বলছেন নুসরাত।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আশিক সেলিম বলছেন, ইয়াবা বাংলাদেশে সহজেই সুযোগ করে নিতে পেরেছে, যে দেশে মদ্যপান সহজলভ্য নয় এবং যা বিরূপ চোখেও দেখা হয়।

''একজন তরুণ আমার কাছে এসেছিল, যিনি চমৎকার একটি জীবনযাপন করতেন। তারা বাবা-মা খুবই রক্ষণশীল। যখন তিনি বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেতেন, তার বন্ধুরা বিয়ার খেলেও তিনি সেটা খেতে পারতেন না, কারণ তাহলে মুখে মদের গন্ধ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন না। পরবর্তীতে তিনি ইয়াবা খেতে শুরু করেন। যেহেতু এটার কোন গন্ধ নেই বা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, তাই তিনি এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।''

কিন্তু ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তিরা খুব আরামে খুব বেশিদিন কাটাতে পারেননি। এই মাদকের বিস্তার থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করে বাংলাদেশের সরকার। তারা ইয়াবা রাখার জন্য জরিমানার পাশাপাশি 'ক্রসফায়ারের' মতো ব্যবস্থাও গ্রহণ করে।

ইয়াবা ব্যবসার মূল কেন্দ্র কক্সবাজার জেলার টেকনাফের বাসিন্দা আবদুর রহমান বলছেন, ''একদিন যখন আমি নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বাসায় ফিরছি, আমার বাড়ির সামনে অনেক পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তারা ঘরে ঢুকে আমার ছেলে আবুল কালামকে বাথরুম থেকে ধরে নিয়ে যায়। আমি তাদের বললাম,দয়া করে তাকে ছেড়ে দিন, সে কি করেছে? একজন পুলিশ সদস্য আমাকে বললেন, আপনি চুপ করে থাকুন, না হলে আপনাকে গুলি করে দেবো।''

এর আগে মানব চোরাচালানের জেল খাটা আবুল কালামকে পাঁচদিন থানায় আটকে রাখা হয়। এরপর তারা বাবা একটি খারাপ সংবাদ শুনতে পেলেন।

''পুলিশ আমাকে জানালো যে, আমার ছেলে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।'' তিনি বলছেন।

থানা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ৯ই জানুয়ারি নিহত হয় আবুল কালাম। পুলিশ জানিয়েছে সে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সে সময় আরেকজন ব্যক্তিও নিহত হয় এবং তাদের কাছ থেকে ২০ হাজার ইয়াবা আর পাঁচটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, ২০১৮ সালে সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানে প্রায় ৩০০ ব্যক্তি নিহত হয়েছে।

তবে ইচ্ছে করে গুলি করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন।

''অনেক সময় আমরা একটি অপারেশনে যাই, যেখানে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মোকাবেলা করতে হয়। আমি মনে করি, এটা সেরকম একটি ঘটনা ছিল।''

''কাউকে গ্রেপ্তারের পর আমরা থানায় নিয়ে আসি। এরপর জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য সংগ্রহের পর আমার অপারেশন শুরু করি। আপনি যখন অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবেন, অনেক সময় তারা পুলিশের সঙ্গে লড়াই করে। সে হয়তো সেরকম ঘটনায় নিহত হয়েছে।'' বলছেন মি. হোসেন।

কিন্তু সবগুলো ঘটনাতে একই রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। সেটা কেন?

''সবগুলো ঘটনায় হয়তো একরকম, তখন পরিস্থিতিওতো একই হবে। সুতরাং আমি কিভাবে আরেকরকম বর্ণনা দেবো?''

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে টেকনাফে একটি বিরল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পুলিশ। উৎসবমুখর পরিবেশে হাজার হাজার মানুষের সামনে সেখানে ১২০জন স্থানীয় বাসিন্দা- যাদের বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ আছে, তারা কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

এদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপির আত্মীয়স্বজন এবং অন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। অস্ত্র ও সাড়ে তিনলাখ ইয়াবাও জমা দেয়া হয়।

সেই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, ''আপনাদের আজকের উপস্থিতি প্রমাণ করছে যে, টেকনাফ ও সারাদেশ থেকে আমরা ইয়াবা দূর করে দিতে পারবো।''

তবে আত্মসমর্পণকারী শাখাওয়াত আলমের ভাই মোহাম্মদ আলমগীর বলছেন, জীবন বাঁচাতে তার ভাই আত্মসমর্পণ করেছেন।

''যাদের 'ক্রসফায়ার' করা হবে, তার একটি তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। আমার ভাই যখন সেটি জানতে পেরেছে, সে খুবই ভয় পেয়েছিল, সে কারণে আত্মসমর্পণ করেছে।''

তবে কোন প্রকার চাপ সৃষ্টির অভিযোগ নাকচ করে দিলেন পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন।

''আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এখানে কোন 'ক্রসফায়ার' লিস্ট নেই। আমরা সবসময়েই তাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করি।''

তিনি বলছেন, ফেব্রুয়ারির আত্মসমর্পণের পর থেকে কক্সবাজার জেলায় ইয়াবার ব্যবসা ৭০% কমে গেছে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ প্রায় সাড়ে ৫ কোটি ইয়াবা আটক করে। এই অবৈধ ব্যবসার অর্থমূল্য প্রায় একশো কোটি ডলার।

বাংলাদেশে কত মাদকাসক্ত রয়েছে, তার কোন নির্ভরযোগ্য জরিপ নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এই সংখ্যা হতে পারে প্রায় ৪০ লাখের মতো, কিন্তু বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে সেটি হবে প্রায় সত্তর লাখ। এদের অন্তত এক তৃতীয়াংশ ইয়াবা আসক্ত।

ইয়াবা আসক্তির এক পর্যায়ে মানসিক সমস্যা হতে শুরু করে মোহাম্মদের।

''আমি সবসময়েই সংশয়ে থাকতাম এবং মনে হতো যে কেউ একজন আমার কথা শুনছে, কেউ আমার দিকে নজর রাখছে''- বলছেন মোহাম্মদ।

যখন তার জীবন একেবারেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পথে, তখন জোর করে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয় মোহাম্মদকে। তার পরিবারের অনুরোধে একদল লোক এসে তাকে জোর করে সেই কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তিনি চার মাস চিকিৎসা নেন এবং প্রায় একবছর ধরে সুস্থ রয়েছেন। এখন সেই ক্লিনিকেই স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করছে।

''এখন আমি মনে করি, সে আবার চাকরি করার জন্য প্রস্তুত হয়েছে,'' বলছেন নুসরাত, মোহাম্মদের স্ত্রী। ''কিন্তু আমি তাকে কখনোই চাপ দেবো না। সে যদি কখনো কোন সাহায্য চায়, সেজন্য এখানে আমরা সবাই রয়েছি।''

বিবিসি



মন্তব্য