ঢাকা - আগস্ট ২১, ২০১৯ : ৫ ভাদ্র, ১৪২৬

নুসরাত হারেনি, হেরে গেছে মানবতা

নিউজ ডেস্ক
এপ্রিল ১৭, ২০১৯ ১০:৩৩
২৩২ বার পঠিত

শাওন মুকুল

নুসরাত জাহান রাফি (১৮) সবাইকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। কিন্তু অনেকের মনে আগুন লাগিয়ে গেছেন। তার গ্রামে শোকের মাতম এখনো চলছে। কোনো বাবা-মার কোল এভাবে খালি হোক এটা কেউ চায় না। যে মেয়েটা পরীক্ষার হলে গিয়েছিলো স্বপ্ন নিয়ে, তাকে কেন আগুনে পুড়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলো। ২০১৬ সালেও নুসরাতের চোখে চুন মেরেছিল দুর্বৃত্তরা। তখন হাসপাতালে মেয়েটির চিকিৎসা করানো হয়।

রাফির ‘আগুন’ ছড়িয়েছে সবখানে। ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ। হত্যার বিচার চেয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ঝড় । রাফির জন্য কেঁদে বুক ভাসিয়েছে অনেক সহপাঠী। কান্নায় ভেঙে পড়েছে সন্তান হারানো আরো অনেক বাবা-মা। কান্নার রোল পড়েছে স্বজনদের মাঝে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে মারা যাওয়া রাফির মামলায় যাতে কোনো গাফিলতি না হয়। সাগর-রুনি, ত্বকী, তনুসহ অন্যান্য মামলার মতো কোনোভাবেই যেন এই মামলা হারিয়ে না যায়। নুসরাত হত্যার বিচার হোক দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। দেয়া হোক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যাতে এমন দুস্কর্ম করতে কেউ দুঃসাহস দেখাতে না পারে।

যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় রাফিকে মেরে ফেলা হলো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদ করে নুসরাত এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে এসে কেরোসিন ঢেলে ধরিয়ে দেয়া আগুনে পুড়ে গুরুতর আহত হন। আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। ১০ এপ্রিল বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচ দিন লড়ার পর মারা গেলেন।

তার অপরাধ তিনি ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার কুপ্রস্তাবে রাজি হননি। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলা তুলে নিতে চাপ দিলেও সাহসীকতা দেখিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। তিনি হারেননি, হেরে গেছে বাংলাদেশ, হেরে গেছে মানবতা।

এক্ষেত্রে খুনির পরিচয় তিনি অধ্যক্ষ, আলেম কিংবা মাদ্রাসার হুজুর নন; তিনি যৌন উন্মাদ,পশুর চেয়েও নিৎকৃষ্ট, বিকৃত মস্তিষ্কের ভন্ড দানব, হুজুর নামের কলঙ্ক, মাদ্রাসার কলঙ্ক, দলের কলঙ্ক এবং কুলাঙ্গার। যার লালসতা নিজের শিক্ষার্থীকে হত্যার মতো সিদ্ধান্ত দিতে পারে তিনি কিছুতেই শিক্ষক নন। তিনিসহ তার নির্দেশে গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যাওয়া তার সাগরেদদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

সোনাগাজী উপজেলার উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, 'আমাকে ভালো বলেন আর খারাপ বলেন আমি তাকে গুনে ৪টি বেতের বাড়ি দিয়েছি। বেতটিও তার ছিল। গত ২৭ মার্চ ঘটনা শুনেই আমি রাফিকে নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি অধ্যক্ষ হাত-পা ছেড়ে সোফার ওপর বসে আছেন। মেয়েকে শ্লীলতাহানির বিষয়ে প্রশ্ন করার পর তিনি আমাকে রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের ভয় দেখান এবং অশ্লীল মন্তব্য করেন। তখন আমি স্থির থাকতে পারেনি। ভীত না হয়ে সামনে পাওয়া তার টেবিলের ওপর রাখা একটি বেত দিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজকে ৪ বার বেত্রাঘাত করি।'

শিরিন আক্তার জানান, আমাকে নিয়েই ছিল নুসরাতের যত আহ্লাদ। ছোটবেলা থেকেই মাকে ছাড়া নুসরাত ঘুমাতেন না। মাকে নিয়ে দেয়ালে অনেক কিছু লিখেছেন। ছোটবেলা থেকেই বেশ সাহসী ছিলেন নুসরাত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদীও ছিলেন নুসরাত। অনেক আগে থেকেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের অপকর্মের কথা শুনে এসেছি। নুসরাত পাশের একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর এই মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছি। আমরা আলিম পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নুসরাতকে অন্য মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছি। তার আগেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নুসরাত চিরবিদায় নিল।

মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নুসরাতকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে নুসরাতের মায়ের করা মামলায় গত ২৭ মার্চ ওই অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। দু:খজনকভাবে তার মুক্তির দাবিতে ‘সিরাজ উদ দৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামে ২০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক নুর উদ্দিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হন শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে গত ২৮ ও ৩০ মার্চ উপজেলা সদরে দুই দফা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। তারাই নুসরাতের স্বজনদের হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন।

অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে ৪ এপ্রিল বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি দেয়া হয়। ওই দিনই নুর উদ্দিন, শাহাদাত ফেনী কারাগারে সিরাজ উদদৌলার সাথে দেখা করে তার কাছ থেকে নুসরাতকে হত্যার আদেশ পান। পরদিন ৫ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টায় নুর, শাহাদাত, মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের প্রধান আবদুল কাদের, জাবেদ হোসেনসহ নুসরাত হত্যা মামলার কয়েক আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার পশ্চিম ছাত্রাবাসে বৈঠক করে তাকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে কে বোরকা আনবে, কে কেরোসিন আনবে, কে কোথায় থাকবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগে থেকেই ৭০ টাকা দিয়ে এক লিটার কেরোসিন কিনে আনেন নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম। তিনি দোকানদারকে পলিথিনে কেরোসিন দিতে বললে দোকানদার তাকে সন্দেহ করে। তখন শাহাদাত বলেন, লাকড়িতে আগুন ধরানোর জন্য কেরোসিন লাগবে। তিনজন পুরুষের জন্য তিনটি বোরকা দরকার ছিল। পপির বান্ধবী কামরুন্নাহার মণিকে দুই হাজার টাকা দেয়া হয় বোরকা কেনার জন্য। তিনি তিনটি বোরকা এনে শাহাদাতকে দেন। তিনটি হাতমোজাও তিনি সংগ্রহ করেন। সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম তাঁদের ১০ হাজার টাকা এবং এক শিক্ষক পাঁচ হাজার টাকা দেন। এর মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা তিনি নুর উদ্দিনকে দেন। আর তিনটি বোরকা কেনার জন্য তাঁর চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে ও ওই মাদ্রাসার ছাত্রীকে দেন দুই হাজার টাকা।

৬ এপ্রিল সকালে নুসরাতের শরীরে গলা থেকে পা পর্যন্ত এক লিটার কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া হয়। আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত পাঁচজনের প্রত্যেকেই বোরকা এবং নেকাব ছাড়াও হাত ও পায়ে মোজা লাগিয়ে নিয়েছিলেন। দুটি কারণে নুসরাতকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমত, শ্লীলতাহানির মামলা করে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করিয়ে নুসরাত শিক্ষক সমাজকে ‘হেয়’ করেছেন। দুই. আসামি শাহাদাত নুসরাতকে বারবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু নুসরাত তা গ্রহণ না করায় শাহাদাতও হত্যার পরিকল্পনা করেন।

এসব মামলা বা হামলার বিচার দাবি করতে হবে কেন? হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার বা বিচার করার জন্য কেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দিতে হবে? কেন হাইকোর্টকে মামলা তদারকী করতে হবে? সব নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তা দেয়াইতো স্বাধীন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ। অপরাধীর পক্ষেতো কেউ থাকার কথা নয়! থাকলে তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। না হলে বাবা-মাদের মেয়েদের নিয়ে শঙ্কা বাড়বে, জমিন নারীর জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠবে। ধর্ষক বা যৌন হয়রানিকারীর কোন দল বা মতের, কোন ধর্মের তা দেখারব্যিাপার নয়। ধর্ষকের পরিচয় শুধুই ধর্ষক।

২৭ শে মার্চ নুসরাত যখন পুলিশে অভিযোগ করতে চান- তখনকার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তাকে বলছেন, ঘটনাটি তেমন বড় কিছু নয়। এর পরপরই অভিযুক্তের সমর্থকরা নুসরাতকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। তার পরিবারের সদস্যরা মিডিয়াকে বলেছেন, হামলার আগে তাদেরকে মামলা তুলে না নিলে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু নুসরাত ন্যায় বিচারের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন।

সমাজ থেকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মতো ঘৃণ্য-নিষ্ঠুর অপরাধের পুনরাবৃত্তি দূর করতে অন্যায়কারী প্রভাবশালী হলেও চরম ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা চাই। নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাদরাসার যেসব ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহণ করেছেন, নুসরাতের শরীরে আগুন লাগিয়েছেন তারা কত বড় অমানুষ! নুসরাত হারেনি, অমানুষদের কারণে হেরে গেছে মানবতা।



মন্তব্য