ঢাকা - জুন ২৫, ২০১৯ : ১০ আষাঢ়, ১৪২৬

আমি মা হবো এটাই কি আমার অপরাধ?

নিউজ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯ ০৮:২৮
৯৭ বার পঠিত

হোসনে আরা বীণা। সদ্য ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়েছে তাকে। ৬ দিন আগেও তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। এরও আগে তিনি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। পরপর নারায়ণগঞ্জের দুটি উপজেলায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অনেকটা পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন নারায়ণগঞ্জের উপজেলা প্রশাসনে। তবে ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা-চিকিৎসার পরও কোনো সন্তান লাভ করতে পারেননি। কিন্তু ৫ মাস আগে সন্তানসম্ভাবনার সংবাদে আনন্দের বন্যা বইছিল দুই পরিবারে। অসুস্থ শরীর নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন হোসনে আরা বীণা।

কোনো ক্লান্তিই যেন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি আগত সন্তানের আগমনী বার্তায়। কিন্তু কে জানতো এই সন্তানসম্ভাবনাই তার জন্য কাল হবে। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি তাকে ওএসডি করা হয়। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সাড়ে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বাকালীন সময়েই প্রিমেচিউর সন্তানের জন্ম দিতে হয়েছে তাকে। আকস্মিকভাবে কর্মক্ষেত্রে এমন সংবাদে মানসিকভাবে বিপযস্ত হোসনে আরা বীণা কোন কারণই খুঁজে পাচ্ছেন না কেন তার বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেয়া হলো। নিরুপায় হয়ে ৮ই ফেব্রুয়ারি রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি তার আইডিতে হৃদয়স্পর্শী একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি বলেছেন, সদ্য নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তদবিরে তাকে ওএসডি করা হয়েছে।

হোসনে আরা বীণার স্ট্যাটাসটি হুবহ তুলে ধরা হলো: ‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হলো এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো... আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি। আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয় এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।’
‘আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত ফাকিবাজি এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম আমি করিনি। অথচ আমি সন্তানসম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলির পাঁয়তারা করেই চলেছিল। আমার সন্তানসম্ভবা হওয়াকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এজন্য আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।’
বীণা বলেন, ‘আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল আগামী এপ্রিল। তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। কিন্তু গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বিকালে রেগুলার চেকআপ করতে আমি হাসব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি, চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমার হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য। এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার অপরাধ হলো আমি সন্তানসম্ভবা, আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির। খবরটা শোনার পর আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি, উল্লেখ্য আমি এজমার রোগী। প্রচণ্ড মানসিক চাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষণিক হসপিটালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রিমেচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে!!!’
সদ্য ওএসডি হওয়া এই ইউএনও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্ষোভের সঙ্গে লিখেন, ‘আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কি অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানি না!!! তবে জানি একজন সব দেখেন, তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তাব্যক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলবো তুমি এর বিচার করো!!! আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’



মন্তব্য