ঢাকা - আগস্ট ২৩, ২০১৯ : ৭ ভাদ্র, ১৪২৬

চীনের উইঘুর মুসলিম বন্দিশিবির মানবতার জন্য লজ্জাজনক: বন্ধের আহ্বান তুরস্কের

নিউজ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯ ১৮:৫৬
১৩৯ বার পঠিত

উইঘুরের বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আবদুর রহিম হেয়িত। কোনো অভিযোগ ছাড়াই চীনা কর্তৃপক্ষ তাকে বন্দী করে রেখেছিল। আটক হওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৫৫ বছর। দুই বছর ধরে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর গত শনিবার তিনি কারাগারে মারা যান : ইন্টারনেট -

চীনের মুসলিম বন্দিশিবিরগুলোতে ১০ লক্ষাধিক উইঘুর মুসলিমকে আটকে রাখার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এগুলো বন্ধের জন্য বেইজিংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তুরস্ক। আবদুর রহিম হায়াত নামে উইঘুর জনগোষ্ঠীর প্রখ্যাত এক সঙ্গীত শিল্পীর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর এ আহ্বান জানিয়েছে তুরস্ক।

শনিবার তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উইঘুরদের বন্দিশিবির হিসেবে ব্যবহৃত চীনের এসব বন্দিশিবির মানবতার জন্য ভয়াবহ লজ্জাজনক। উইঘুর কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আট বছরের সাজা ভোগ করছিলেন আবদুর রহিম হায়াত নামের ওই প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী। তার মৃত্যুর পর শনিবার তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হামি আকসয় বলেন, চীনের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’ ১০ লাখেরও বেশি উইঘুরকে আটকে রাখার বিষয়টি এখন আর গোপন কিছু নয়। এসব নিপীড়ন কেন্দ্রে নির্যাতনের মাধ্যমে বন্দীদের মগজধোলাই করা হয়। মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসব বন্দিশিবির বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে তুরস্ক। নিপীড়ন কেন্দ্র ও কারাগারগুলোতে তাদের নির্যাতন, রাজনৈতিক মগজধোলাইয়ের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, চীনা কর্তৃপক্ষকে আমরা উইঘুর তুর্কিদের মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানাই। একই সাথে বন্দিশিবিরগুলোও বন্ধের আহ্বান জানচ্ছি। যারা বাইরে আছেন তারা ‘প্রবল চাপের মধ্যে’ আছেন বলে বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেছেন তিনি। আকসোদ বলেছেন, ‘একুশ শতাব্দীতে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের পুনঃপ্রবর্তন এবং উইঘুর তুর্কিদের বিরুদ্ধে চীনা কর্তৃপক্ষের সুপরিকল্পিত আত্তীকরণ নীতি মানবতার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।’ তিনি আরো বলেন, হেয়িতের মৃত্যুতে ‘জিনজিয়াংয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তুরস্কের জনগণের প্রতিক্রিয়া আরো তীব্র হয়েছে’। সেখানকার ‘শোচনীয় মানবিক পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য’ তিনি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। হেয়িতের মৃত্যুর খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তবে তার মৃত্যুর এ খবর সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

হেয়িত একজন প্রখ্যাত দোতারা বাদক ছিলেন। এক সময় পুরো চীনের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন এই শিল্পী। তিনি বেইজিংয়ে মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং জাতীয় শিল্পী দলগুলোর সাথে দোতারা বাজাতেন। ‘বাবা’ নামের একটি গান গাওয়ার জন্য তাকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। একটি উইঘুর কবিতা থেকে গানটির কথাগুলো নেয়া হয়েছিল। ওই কবিতায় উইঘুর তরুণ প্রজন্মকে তাদের পূর্ববর্তীদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান ছিল। কিন্তু ওই গানের কথার দু’টি শব্দ, ‘যুদ্ধের শহীদ’, চীনা কর্তৃপক্ষকে এ ভাবনার দিকে নিয়ে যায় যে হেয়িত সন্ত্রাসবাদের হুমকি হয়ে উঠছেন। চীন দাবি করে, জিনজিয়াংয়ের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো ‘ভোকেশনাল এডুকেশন সেন্টার’ এবং এগুলো ওই অঞ্চলের সন্ত্রাসবাদ প্রশমিত করতে ডিজাইন করা হয়েছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুংয়ের শাসনামলে দেশটিতে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা ও নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ২০১০ সালে সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টির গোপন নথির সূত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন, মাও সে তুংয়ের শাসনামলে অন্তত চার কোটি মানুষ ক্ষুধা ও নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারিয়েছে। উইঘুররা চীনের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং অঞ্চলের তুর্কিভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী। ২০১৮ সালের আগস্টে জেনেভায় চীনের ওপর জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির দুই দিনের বিশেষ সভায় উঠে আসে চীনে উইঘুরদের বন্দিশিবিরে আটকে রাখার বিষয়টি। সভায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির জাতিগত বৈষম্যবিষয়ক সংস্থা জানায়, চীনে ১০ লাখ উইঘুর মুসলিমকে আটকে রাখা হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ স্বায়ত্তশাসিত উইঘুর প্রদেশকে কার্যত ‘বিশাল একটি বন্দিশিবিরে’ পরিণত করেছে।

২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এইসব ভয়াবহ উইঘুর বন্দিশিবিরের কথা অস্বীকার করে আসছিল চীন। অক্টোবরে প্রথমবারের মতো এসবের অস্তিত্ব স্বীকার করে তারা দাবি করতে থাকে, ছোটখাট অপরাধের জন্য এসব কেন্দ্রে আটক রেখে তাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরেই জিনজিয়াং প্রদেশ থেকে উইঘুরসহ অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের আটকের খবর সামনে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসঙ্ঘের কাছে এ ব্যাপারে রিপোর্ট দিয়েছে। এসব রিপোর্টে উইঘুর মুসলিমদের গণহারে আটকের অভিযোগ তোলা হয় চীনের বিরুদ্ধে। এতে বলা হয়েছে, উইঘুর মুসলিমদের গণহারে ধরে বিভিন্ন বন্দিশিবিরে নেয়া হচ্ছে। এরপর সেসব শিবিরে তাদের জোর করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য করা হচ্ছে।

আলজাজিরা ও বিবিসি



মন্তব্য