ঢাকা - ডিসেম্বর ১২, ২০১৮ : ২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

নির্বাচনী আইন কি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?

নিউজ ডেস্ক
ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮ ১৯:৫০
২৩ বার পঠিত

''এই দেশের রাজারা কখনো চায় না যে প্রজারা রাজা হোক। সেইরকম এমপি-মিনিস্টাররা কখনো চায় না যে সাধারণ মানুষ এমপি-মিনিস্টার হোক।"

বলছিলেন বগুড়ার একটি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাওয়া ক্ষুব্ধ আশরাফুল হোসেন আলম, যিনি 'হিরো আলম' নামেই বেশি পরিচিত।

তার কথা: "এই দেশের রাজারা চায়, তারাই এমপি হোক, তাদের বউ-ছেলেমেয়েরা এমপি হোক। এরা জনসাধারণকে আসতে দিবে না রাজনীতিতে।''

স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে যে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিতে হয়, সেই তালিকায় স্বাক্ষর না মেলার অভিযোগে তার প্রার্থিতা বাতিল করে দিয়েছেন জেলা রিটার্নিং অফিসার।

হিরো আলমের দাবি, তার তালিকা ঠিকই ছিল কিন্তু সেটি ভালোমতো যাচাই না করেই তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়া হয়েছে।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন ৪৯৮জন। কিন্তু এদের মধ্যে বাতিল হয়ে গেছে ৩৮৪ জনের মনোনয়নপত্র। অর্থাৎ সারাদেশে সব মিলিয়ে মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে মাত্র ১১৪ জনের।

কেন এত বিপুল স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারণ হিসাবে ১ শতাংশ ভোটার তালিকার গরমিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে কাগজপত্র ঠিকভাবে না থাকার কথাও বলা হয়েছে কোন কোন স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে।

স্থানীয় সংবাদদাতারা বলছেন, যাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা, যারা দলটির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে অন্তত সত্তরটি আসনে তাদের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বিএনপিতেও। অনেক আসনে দলটির স্থানীয় নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছেন।

২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জারি করা গেজেটে এই বিধানটি সংযুক্ত করা হয়েছিল যে, কোন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন করতে হলে সমর্থক হিসাবে ওই এলাকার মোট ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষর বা টিপসহি থাকতে হবে। তবে পূর্বে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে এটি প্রযোজ্য হবেনা।

এই বিধানের পক্ষে তখনকার কমিশনের পক্ষ থেকে যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছিল, নির্বাচনে প্রার্থীদের সংখ্যা সীমিত এবং যোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এই বিধানটি সহায়ক হবে।

গেজেট অনুসারে, প্রার্থীদের জমা দেয়া তালিকা থেকে দৈব চয়নের ভিত্তিতে ১০জন ভোটারের তথ্য যাচাই করে দেখা হয়। সেখানে কোন গরমিল পাওয়া গেলে প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়া হবে।

এই গরমিলের কারণ দেখিয়েই বেশিরভাগের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেছে।

কি বলছেন প্রার্থীরা?

কিন্তু এ নিয়ে আপত্তি করছেন প্রার্থীরা। তারা বলছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে যেভাবে যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়।

গোপালগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী, অবসরপ্রাপ্ত জজ শামছুল আলম খান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন যে, ''আমাকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। এটা আমার বিরুদ্ধে সাজানো নাটক।''

ফরিদপুরের একজন প্রার্থী লিটন মৃধা বলছেন, ''কেন বাতিল হয়েছে, আপনারা তো বোঝেন। প্রথমে ভাবছিলাম, আপিল করবো। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে আর আপিল না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।''

টেলিফোনে তিনি এর বেশি আর বলতে চাননি।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন বাধ্যতামূলক করে ২০১১ সালে একটি গেজেট জারি করা হয়

তবে এই প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ।

তিনি বলছেন, ''স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই যে ১ শতাংশ স্বাক্ষর রাখার বিধান রাখা হয়েছে, সেটা অনেকগুলো কারণেই মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।"

"প্রথমত, যিনি ভোটার, তার প্রার্থী হওয়ার অধিকার রয়েছে, সেটা ক্ষুণ্ণ হলো। দ্বিতীয়ত, যে ভোটাররা সেখানে স্বাক্ষর করে সমর্থন করবেন, এটা তাদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। কারণ তিনি গোপন ব্যালটে ভোট দেবেন, অথচ এখানে কেন তাকে প্রকাশ্য করে দেয়া হচ্ছে যে, তিনি কাকে ভোট দেবেন। এটা তার অধিকার এবং তার জন্যও ক্ষতিকর।''

''আমি মনে করি, এখনো সময় আছে, যেসব ভুলত্রুটি হয়েছে, নির্বাচন কমিশন সেসব সংশোধন করতে পারে'' - বলেন তিনি।

তোফায়েল আহমেদ বলছেন, ''দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের দমন করার জন্য এটি একটি পন্থা হতে পারে। কিন্তু দলের বিদ্রোহী প্রার্থী দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে দমাতে হবে। নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচনী আইনের কাঁধে বন্দুক রেখে এটা শিকার করা ঠিক না। নির্বাচনের সময় অন্তত প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত।''

যুক্তরাজ্যের আইনে কি বিধান আছে?

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিতে হলে দশজন ভোটারের স্বাক্ষর থাকতে হবে। এদের দুইজন প্রস্তাবক এবং সমর্থক হবেন।

এরা সবাই অবশ্যই নির্বাচনী ওয়ার্ড বা আসনের ভোটার হিসাবে তালিকাভুক্ত হতে হবে।

মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণে অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না

নির্বাচন কমিশন কি বলছে?

অনেক প্রার্থী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। ৬ ডিসেম্বর থেকে এসব আপিলের শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার কবিতা বলছেন, ''এটা তো আইনের একটা বিধান, আইনের বাইরে যাওয়ার তো সুযোগ আমাদেরও নেই। তবে তাদের আপিল করার সুযোগ আছে। যদি দেখা যায় যে, এটি আইনসম্মতভাবে বাতিল হয়নি, তখন কমিশন সেখানে ব্যবস্থা নিতেই পারে।''

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কি বলছে?

প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা যাই বলুন না কেন, স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেকেই দলের মনোনীত প্রার্থীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে - যা নিয়ে দলীয় নেতারাও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে আজ সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে তার দলের অবস্থান কি।

"মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার আগে বলা যাবে না কে বিদ্রোহী। তবে শেষ পর্যন্ত কেউ বিদ্রোহী হলে তাকে বহিষ্কার করা হবে আজীবনের জন্য" - বলেন তিনি।

ওদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, এবারের নির্বাচন বিএনপির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটি অনুধাবন করেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিবেন বলে আশা করছেন তিনি।

বিবিসি



মন্তব্য