ঢাকা - সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ : ৬ আশ্বিন, ১৪২৬

মৃত খাশোগি জীবিত খাশোগির চেয়েও শক্তিশালী

নিউজ ডেস্ক
অক্টোবর ২৮, ২০১৮ ১১:৫৭
৩৯৫ বার পঠিত

শাওন মুকুল

প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড নিয়ে উত্তাল বিশ্ব রাজনীতি ও সরব বিশ্ব মিডিয়া। সৌদি সরকারের কঠোর সমালোচনা করায় যেই খাশোগিকে স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে, সেই খাশোগিই মৃত্যুর পর সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। আগে তাকে ক’জন মানুষ চিনতো, এখন চেনে বিশ্ববাসী। আলোচনা-সমালোচনায় মৃত খাশোগি জীবিত খাশোগির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। জীবিত খাশোগির লেখা কিংবা বক্তব্য কতজন মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল! একজন সাংবাদিক যখন প্রায় মাসখানেক ধরে বিশ্ব মিডিয়ার লীড নিউজে থাকেন তখন তাকে দুর্বল বলা যায় না।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সংস্কার পরিকল্পনার বিরোধী খাশোগি একসময় সংবাদপত্র আল ওয়াতানের সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন, কাজ করেছেন একটি সৌদি টেলিভিশন চ্যানেলেও। খাশোগি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করতেন। খাশোগি ছিলেন সমসাময়িক অন্যতম সেরা রাজনৈতিক মন্তব্যকারী। জীবনের ৩০ বছর কাটিয়েছেন সাংবাদিকতা পেশায়। ১৯৫৮ সালে সৌদি আরবের মদিনায় জন্ম তার। একসময় তিনি সৌদি রাজপরিবারের ক্ষমতাবানদের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজপরিবারে সংস্কারবাদী হিসেবে তার সুনাম ছিল। সৌদি আরবের আঞ্চলিক ও ঘরোয়া অনেক নীতিমালার সমালোচনাও করতেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ার পর ইংরেজি ভাষার সৌদি গেজেট পত্রিকায় প্রতিনিধি হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন জামাল খাশোগি।

১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি লন্ডন-ভিত্তিক সৌদি মালিকানাধীন আশারক আল-আওসাতের প্রতিনিধি ছিলেন। এছাড়া আরব দুনিয়ায় বহুল পরিচিত আল হায়াত পত্রিকায় ৮ বছর কাজ করেন তিনি। তবে খাশোগি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, কুয়েত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে সংবাদ করার কারণে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি তিনি বেশ কয়েকবার ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নেন। ১৯৯৯ সালে সৌদি আরবের বিখ্যাত পত্রিকা আরব নিউজের উপ-সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। চার বছর সেখান থেকে তিনি আল ওয়াতান পত্রিকার প্রধান সম্পাদকের পদ পান। তবে ২০০৩ সালে মাত্র দুই মাসের মাথায় কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সেখান থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তবে কেউ কেউ মনে করেন, তার গৃহীত ‘সম্পাদকীয় নীতি’ই ছিল এর কারণ।

এরপর তিনি সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থা জেনারেল ইন্টিলিজেন্স ডিরেক্টোরেটের প্রধান প্রিন্স তুরকি বিন ফয়সালের গণমাধ্যম উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। এরপর ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালের শেষ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি ফের আল ওয়াতান পত্রিকার সম্পাদক হন। কিন্তু ২০১০ সালে তাকে ফের বরখাস্ত করা হয়। নিজের ওয়েবসাইটে খাশোগি তখন লিখেছিলেন, ‘সৌদি সমাজের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কে’ উৎসাহ দেওয়ার কারনেই তাকে বরখাস্ত করা হয়।

ওই বছরই তিনি আল আরব নিউজ চ্যানেলের জেনারেল ম্যানেজার পদে নিয়োগ পান। এই চ্যানেলের মালিক ছিলেন প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল। এটি পরিচালিত হতো বাহরাইনের মানামা থেকে। কিন্তু ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরুর মাত্র এক দিনের মাথায় ওই চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি আরবের বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতা নেয়ার পর খাশোগির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া শুরু হয় সৌদি রাজ পরিবারের । খাশোগি এ সময় যুবরাজের বিভিন্ন ঘরোয়া নীতির সমালোচনা করেন। বিশেষ করে, যুবরাজের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ভিন্নমতালম্বীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন নিয়ে খাশোগি সরব ছিলেন।

জামাল খাশোগির কাজের প্রশংসায় ওয়াশিংটন পোস্ট এক বিবৃতিতে বলেছে, খাশোগি হলেন নিজ কর্মক্ষেত্র ও দেশে সবচেয়ে প্রখ্যাত চিন্তকদের একজন। ওয়াশিংটন পোস্টে তার সহকর্মী জ্যাসন রেজাইয়ান লিখেন, খাশোগি পাঠকদের কাছে অভেদ্য একটি দেশ সম্পর্কে অন্তদৃষ্টিপূর্ণ মন্তব্য ও তির্যক সমালোচনা উপস্থাপন করতেন। নিজের মাতৃভূমির সমালোচনা করলেও তিনি প্রায়ই দেশের জন্য নিজের ভালোবাসা ও দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রায়ই নিজের এই বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করতেন যে, সৌদি আরব একদিন আরো ভালো করবে। ওয়াশিংটন পোস্টে খাশোগির সম্পাদক ক্যারেন আতিয়াহ বলেন, তার সম্পাদক হিসেবে তার সঙ্গে আলাপচারিতা থেকে আমি বলতে পারি তিনি কত সৎভাবে নিজের দেশকে ও জনগণকে ভালোবাসতেন। তিনি মনে করতেন, দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্য চিত্র তুলে ধরা তার দায়িত্ব।

তুর্কি বাগদত্তা হেতিস চেঙ্গিসের সাথে বিয়ের প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র আনতে গিয়ে ইস্তাম্বুলে সৌদি কন্সুলেটে ২ অক্টোবর নিখোঁজ হন তিনি। কনস্যুলেটে প্রবেশ করার আগে তিনি নিজের অ্যাপল ওয়াচে রেকর্ডিং চালু করেন। পরে কনস্যুলেট ভবনে প্রবেশের পর তাকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন ও সবশেষে হত্যার ঘটনা সবই ওই অ্যাপল ওয়াচে রেকর্ড হয়। পরে সেগুলো তার ব্যবহৃত আইফোন ও তথ্য সংরক্ষণের অনলাইন স্টোরেজ ‘আইক্লাউডে’ জমা হয়। এসব রেকর্ডিংয়ে তাকে হত্যা করার ঘটনা প্রমাণ হয়।

নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশের জন্য একটি কলাম পাঠিয়েছিলেন। কলামে খাশোগি লিখেছেন, বিশ্বে আরব দেশগুলোর মধ্যে একটি মাত্র দেশ আছে যাকে তার মধ্যে শুধু তিউনিশিয়াকেই স্বাধীন বলে উল্লেখ করা যায়। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জর্ডান, মরক্কো এবং কুয়েত। তারা পুরোপুরি নয় বরং আংশিক স্বাধীন। এ ছাড়া আরব দেশগুলো স্বাধীন নয় বলেই বিবেচিত। এর ফলে এসব আরব দেশগুলোতে যারা বসবাস করছেন তারা হয় অজ্ঞ অথবা তাদের ভুল তথ্য দেয়া হয়। তারা অনেক বিষয় নিয়েই প্রকাশ্যে আলোচনা করতে পারেন না। যেসব জিনিস দেশকে প্রভাবিত করছে বা নিজেদের প্রাত্যহিক জীবন যাপন নিয়েও মুখ খুলতে পারেন না তারা। রাষ্ট্র পরিচালিত মাধ্যমগুলো জনগণের মানসিকতাকে গুরুত্ব দেয় না। যদিও অনেকেই বিশ্বাস করেন না। কিন্তু একটি বৃহদায়তনের লোকজন অনেক সময়ই মিথ্যা তথ্যের শিকার হন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এই অবস্থারপরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই।

খাশোগির হত্যাক সন্দেহভাজন ১৫ সৌদি নাগরিকের নাম, ছবি ও জন্ম তারিখ প্রকাশ করেছে তুরস্কের সংবাদপত্র ডেইলি সাবাহ । খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ কে দিয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।তবে সন্দেহভাজন ১৮ জনকে আটক করেছে সৌদি। আটককৃতদের বিচারের জন্য তুরস্কের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তবে খাশোগি হত্যায় জড়িতদের বিচার সৌদি আরবে করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-জুবাইর। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বলছে, খাশোগির খুনের পেছনে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানই কলকাঠি নেড়েছেন।

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খাশোগির বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিস; প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তরিকতা নিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাতের একাধিক অনুরোধ নাকচ করেছেন তিনি।তিনি এই বর্বরতার সাথে যুক্ত থাকা সবচেয়ে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরও শাস্তি চেয়েছেন এবং তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করার কথা বলেছেন। খাশোগির লাশ পেলে শেষ বিদায়ের জন্য সৌদি আরবে যাবার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন তিনি।

হেতিস চেঙ্গিস তুর্কি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানান, ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে যেতে চাননি সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি। তবে খাশোগির সূত্র তাকে বলেছিল, তুরস্কের মাটিতে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবে না সৌদি কর্তৃপক্ষ। অন্য দেশের দূতাবাসে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক থেকে খাশোগি জেনেছিলেন, যদি ইস্তাম্বুল কনস্যুলেটে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার করা হয় তাহলে সহজে বিষয়টির মীমাংসা করা যাবে। এমন নিশ্চয়তা পেয়ে সংশয় থাকলেও কনস্যুলেটে যান খাশোগি।

স্টাডি রুমের টেবিলে ওপর শুইয়ে খাশোগিকে জীবিত অবস্থায় কেটে টুকরো টুকরো করেন তুবাইগি। পুরো হত্যাকাণ্ডটি ঘটাতে সময় লেগেছে মাত্র সাত মিনিট। হত্যা করার পর তার দেহ সরিয়ে দেয়ার জন্য টুকরো টুকরো করা হয়েছে। খাশোগিকে হত্যা করার জন্য স্কাইপে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অতি ঘনিষ্ঠ সৌদ আল-কাহতানি স্কাইপেই খাশোগির সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ানোর পর হত্যা করার নির্দেশ দেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স। তুবাইগি যখন খাশোগিকে কাটতে শুরু করেন তখন তিনি ইয়ারফোনে উচ্চস্বরে গান শুনছিলেন। এ সময় তিনি তার সহকর্মীদেরও গান শুনতে উৎসাহ দেন। রেকর্ডে তুবাইগিকে বলতে শোনা গেছে, ‘যখন আমি এ কাজ করি তখন গান শুনি। আপনাদেরও এটা করা উচিত।’

মদপান করে খাশোগি হত্যার উদযাপন করে ১৫ সদস্যের ‘কিলিং স্কোয়াড’। খাশোগিকে হত্যা করার পর বেশ খোশ মেজাজেই দেশে ফিরে যান তারা। এ সময় মদপান করে সফলভাবে খাশোগি হত্যার উদযাপন করেন ওই কিলিং স্কোয়াড। ওই কিলিং স্কোয়াডের সদস্যদের বহনকারী একজন তুর্কি গাড়িচালক বলছেন, ওখান থেকে বেড়োনোর পর তারা আমাকে এমন একটা জায়গার খোঁজ দিতে বলেন যেখানে বসে খাওয়া (মদ) যাবে। আমি তাদের ডোনার নামের একটি হোটেলে নিয়ে যাই। এসময় খুবই উল্লসিত অবস্থায় গাড়ির ভেতরেই তারা মদপান করছিল।

তদন্তকারীদের বোকা বানাতে নিজেদের এক সদস্যকে সৌদি সাংবাদিক খাশোগির বেশে সাজিয়েছিল সৌদি হত্যাকারী দল। খাশোগি সুস্থ অবস্থায় কনস্যুলেট ত্যাগ করেছেন- এমন বার্তা দিতেই ওই ব্যক্তিকে খাশোগির পোশাক, দাড়ি-গোফে ‘নকল খাশোগি’ বানিয়েছিলেন। ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গেল ২ অক্টোবর জামাল খাশোগি কনস্যুলেটে ঢোকার দুই ঘন্টা আগে সাধারণ পোশাকে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায় এক ব্যক্তিকে। খাশোগিকে হত্যা করার পর একই ব্যক্তি কনস্যুলেট থেকে বের হন খাশোগির বেশে। পরে ইস্তাম্বুল শহরে ঘোরাঘুরি করার পর একটি টয়লেটে ঢুকে পুনরায় ছদ্মবেশ বদলে ফেলেন তিনি। নকল খাশোগির বেশ ছেড়ে হয়ে যান মোস্তফা মাদানি।

খাশোগির ঘটনায় এই মুহূর্তে পশ্চিমাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক সংকটের মুখোমুখি সৌদি আরব। নাইন-ইলেভেনে টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ হামলার পর বড়ধরনের কূটনৈতিক সংকট এটিই প্রথম। বাদশাহী না হারালেও অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েন সৌদি যুবরাজ।মৃত্যুর ঘটনা স্পষ্ট হওয়ার পর ‘দুঃখপ্রকাশ’ করে খাশোগির পরিবারের কাছে তিনি চিঠি লিখেছিলেন বলে জানিয়েছিল ওয়াশিংটন পোস্ট। যুবরাজ খাশোগিকে ‘জিজ্ঞাসাবাদ ও এক পর্যায়ে মৃত্যু’র ব্যাপারে কিছু জানতেন না বলে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পুরো বিশ্ব জানে, সৌদি সাম্রাজ্যের অনুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো কাজ করবেন আর বাদশাহ-যুবরাজ সে ব্যাপারে কিছুই জানবেন না – এটা অসম্ভব। তাই খাশোগির ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে হস্তক্ষেপ করছেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান।

প্রশ্ন উঠেছে: কেন সৌদি আরব খাশোগি হত্যার ব্যাপারটা প্রথম অস্বীকার করে ১৭ দিন পরে স্বীকার করল? সৌদি আরবের এই স্বীকারোক্তি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? খাশোগি যে হাতাহাতিতে মারা গেছেন তার প্রমাণ কী? হাতাহাতিতে নিহত হলে তার মৃতদেহ কেন টুকরো টুকরো করা হলো? ১৭ দিন কেন সত্যটা প্রকাশ করা হয়নি? তার লাশ কোথায়? বিশ্ব বিবেক এই ঘটনার কি জবাব দেবে? এদিকে খাশোগি হত্যার বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একে জঘন্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে ট্রাম্প। প্রয়োজনে সৌদি আরবের ওপর অবরোধ আরোপের আগাম বার্তা দিয়েছে ফ্রান্স। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, তদন্তে সৌদির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে অবরোধ আরোপের বিষয়টি চিন্তা করা হবে।

খাশোগির হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরবের সঙ্কট শক্তিশালী তরুণ শাসক যুবরাজ মোহাম্মেদ বিন সালমানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সৌদি নেতৃত্বের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বেড়েছে। রিয়াদ শুরুতে খাশোগিকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে সৌদি আরব তা স্বীকার করে। তবে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সৌদি আরবের ক্ষমতাসীন রাজপরিবারের কোনো হাত নেই বলেও দাবি করে। কয়েকবার এই ব্যাপারে রিয়াদের ব্যাখ্যা পরিবর্তন দেশটিকে ভাবমূর্তি সঙ্কটে ফেলেছে। ফলে যুবরাজের অন্যতম উপদেষ্টা সৌদ আল-কাহতানিকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এতকিছুর পরও সৌদি আরবের সরকার সমর্থিত গণমাধ্যম দেশটির ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজের ঘটনাকে চক্রান্ত বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এসব গণমাধ্যম বলছে, সৌদি আরবকে বিপদে ফেলার জন্য এটা হচ্ছে একটা ‘ষড়যন্ত্র’। এ ঘটনাকে আল-আরাবিয়া নিউজ চ্যানেল মুসলিম ব্রাদার হুড ও কাতারের গণমাধ্যমের ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছে। অন্য এক খবরে জামাল খশোগির বাগদত্তার সত্যিকার পরিচয় নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে আল-আরাবিয়া। সৌদি আরবের দৈনিক ওকায পত্রিকা বলেছে, খাশোগি কাতারের স্বার্থ নিয়ে কাজ করছিলেন। যেসব সন্ত্রাসী সৌদি সরকারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায় তাদের প্রতি খাশোগির সহানভূতি ছিল। সৌদি গেজেট লিখেছে, খাশোগির নিখোঁজের ঘটনায় কাতারকে দায়ী করা হবে, সৌদি আরবকে নয়। কাতার ও তুরস্ক কর্তৃক দেশটিকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত বলে প্রচার করে আরব মিডিয়া।

জীবিত খাশোগির সময় মোটেই আনন্দের কাটেনি।রিয়াদে বন্ধুরা কারাগারে আটক থাকায় নিহত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি ব্যাপক নিঃসঙ্গতায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছিলেন তার বাগদত্তা।এই নিঃসঙ্গতার কারণেই পরিচিত হওয়ার পরপরই তার সঙ্গে একটি আবেগময় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি।খাশোগি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু তা গৃহীত হয়নি। খাশোগির বড় ছেলে সালাহকে পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি জমাতে হয়েছে। বাবার সমালোচনামূলক লেখালেখির কারণে গত কয়েক মাস ধরে সৌদি কর্তৃপক্ষ তার ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছিল।



মন্তব্য