ঢাকা - ডিসেম্বর ১১, ২০১৮ : ২৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

প্রবেশের দুই ঘণ্টার মধ্যে হত্যা করা হয় খাশোগি

নিউজ ডেস্ক
অক্টোবর ১১, ২০১৮ ১৬:১৪
১০১৫ বার পঠিত

তুরস্কের শীর্ষপর্যায়ের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরবের ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে সৌদি কর্তৃপরে নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থাকা জামাল খাশোগি বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনতে গত সপ্তাহে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের সৌদি কন্স্যুলেটে যান কিন্তু সেখান থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি। প্রবেশের দুই ঘণ্টার মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে তুর্কি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে। তুর্কি সরকার এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজ সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির বিষয়ে সৌদি আরবের কাছে দ্রুত জবাব চেয়েছে ব্রিটেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তুরস্কের ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সৌদি আরবের একটি গুপ্তচর দল জামাল খাশোগিকে হত্যা করেছে। সৌদি কনস্যুলেটে যাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়। তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, খাশোগির শরীর টুকরা টুকরা করা হয় এবং এ জন্য তারা একটি করাত ব্যবহার করেছে। ওই তুর্কি কর্মকর্তা এ ঘটনাকে মার্কিন ক্রাইম ফিল্ম ‘পাল্প ফিকশনে’র সাথে তুলনা করেন। তুরস্কের উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করেন, জামাল খাশোগিকে খুন বা অপহরণের জন্য আগে থেকেই ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে অপেমাণ ছিল সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কিলিং স্কোয়াড বা ঘাতক বাহিনী। তারা মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ঘাপটি মেরে অপোয় ছিলেন কখন খাশোগি হাজির হন। কনস্যুলেটে এটা ছিল তার দ্বিতীয় প্রবেশ। স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত করতে এর আগে আরো এক দফায় সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। তখন তাকে জানানো হয়, কাগজপত্র ঠিক নেই। মঙ্গলবার আবার আসতে হবে। সে অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় কনস্যুলেটে গিয়েই সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় হিট স্কোয়াডের নৃশংস শিকারে পরিণত হন তিনি।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ দেশটির কর্মকর্তারা অবশ্য সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার খবর নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের দাবি, সে দিন কনস্যুলেট থেকে বের হয়ে গেছেন খাশোগি। এর পরিপ্রেেিত তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান সৌদি আরবের কাছে খাশোগির দূতাবাস ত্যাগের প্রমাণ চান। কিন্তু সৌদি আরব এ ব্যাপারে কোনো প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হলে বিষয়টি নিয়ে বিশদ তদন্তের কথা বলেন তুর্কি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
তুর্কি কর্মকর্তারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের কাছে সৌদি আরবের এমন কর্মকাণ্ডকে ‘যথেষ্ট নোংরা’ কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই কর্মকর্তা বলেন, সাংবাদিক জামাল খাশোগি যে দিন নিখোঁজ হন সে দিনই ১৫ সৌদি এজেন্ট (রাষ্ট্রীয় কিলিং মিশনের সদস্য) দুইটি চার্টার ফাইটে তুরস্কে এসে পৌঁছায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তারা তুরস্ক ছেড়ে যায়। আঙ্কারা শনাক্ত করেছে, ওই ১৫ জনের সবাই বা অধিকাংশই সৌদি আরবের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কিংবা সরকারি চাকরিজীবী। তাদের মধ্যে একজন ময়নাতদন্ত বিশেষজ্ঞও ছিল। সম্ভবত নিহতের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করতে সহায়তার জন্য তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এরই মধ্যে এ ঘটনা নিয়ে তুর্কি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পর্যবেণ সম্পর্কে দেশটির প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানকে অবহিত করা হয়েছে। সেখানে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরেই ওই সাংবাদিকের খুন হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। তুর্কি সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ মঙ্গলবার জানিয়েছে, অন্য দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে এ ইস্যুতে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। এতে জামাল খাশোগি খুন হওয়ার বদলে বরং তিনি নিখোঁজ রয়েছেন; এমন সম্ভাবনার প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে। তবে দেশটির একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে এই ঘটনার তদন্তে বিদেশি গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টতার খবর নাকচ করে দিয়েছেন।
তুর্কি কর্মকর্তারা অবশ্য এ ব্যাপারে এখনই বিস্তারিত তথ্য দিতে রাজি নন। কারণ তাদের আশঙ্কা, তাদের হাতে আসা তথ্য এখনই ফাঁস হয়ে গেলে তা ভবিষ্যতে এ ঘটনার সাথে যুক্ত সৌদি এজেন্টদের বিচারকাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেছেন, ওই হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও হাতে পেয়েছে তুর্কি গোয়েন্দারা। কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করতে না চাইলেও এরদোগানের একজন সহযোগী মঙ্গলবার প্রকাশ্যেই ওই ভিডিও নিয়ে কথা বলেছেন। কেমাল ওজতুর্ক নামে সরকারপন্থী এই কলামিস্ট বলেন, তাকে খুনের মুহূর্তের ভিডিও রয়েছে, যা একটি তুর্কি মিডিয়া প্রকাশও করেছে। সাংবাদিক জামাল খাশোগি নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন’। নিখোঁজ সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির বিষয়ে সৌদি আরবের কাছে দ্রুত জবাব চেয়েছে ব্রিটেন। সৌদি কর্তৃপকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব সমান মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করে’।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবেইরের কাছে ফোন করে খাশোগির অন্তর্ধানের বিষয়ে ব্রিটেন জরুরিভিত্তিতে উত্তর প্রত্যাশা করছে বলে জানিয়েছেন। যৌথ মূল্যবোধের ওপর বন্ধুত্ব নির্ভর করে এমনটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সৌদি আরবকে সতর্কও করেছেন। এ ঘটনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের চেয়েও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে যুক্তরাজ্য। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে যুক্তরাজ্য এটিকে ‘খুব গুরুত্বের’ সাথে গ্রহণ করবে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস ও বিবিসি



মন্তব্য