ঢাকা - অক্টোবর ১৬, ২০১৮ : ৩০ আশ্বিন, ১৪২৫

মুফতি হান্নানের যে জবানবন্দি মামলার মোড় ঘুরিয়েছিল

নিউজ ডেস্ক
অক্টোবর ১১, ২০১৮ ১০:১২
৫৩৪ বার পঠিত

বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা এবং একের পর এক হামলার সাথে যার নাম জড়িয়ে আছে তিনি মুফতি হান্নান।

বাংলাদেশে যেসব শীর্ষ জঙ্গির নাম গত ২০ বছর ধরে আলোচনায় ছিল তাদের মধ্যে মুফতি হান্নান উপরের দিকে আছে।

২১ শে আগস্ট আওয়ামী লীগ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়াকে হত্যা, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর সিলেটে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল মুফতি হান্নান।

সিলেটে গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর দেয়া হয়।

রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে মুফতি হান্নানের এক জবানবন্দিতে ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পুরো দৃশ্যপট বদলে দিয়েছিল।

তবে মুফতি হান্নানের সে জবানবন্দি 'জোর করে' নেয়া হয়েছিল বলে বরাবরই দাবি করেছেন তারেক রহমান এবং লুৎফুজ্জামান বাবরের আইনজীবীরা।

বিএনপি নেতাদের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া রায়ের পর বলেছেন, মুফতি হান্নানকে ৪০০ দিন রিমান্ডে রেখে এ স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল।

এমনকি মুফতি হান্নান সে জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছিল বলে দাবি করেন সানাউল্লাহ মিয়া।

মামলায় কী উঠে এসেছে?

শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রথম চিন্তা মাথায় আসে মুফতি হান্নানের।

এতো বড় একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য যুতসই প্লাটফর্ম খুঁজছিলেন তিনি।

এক পর্যায়ে তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুল সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দীনকে একটি প্রস্তাব দেয় মুফতি হান্নান। সে প্রস্তাব ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা।

মাওলানা তাজউদ্দীন এবং মুফতি হান্নান পরস্পরের সাথে পরিচিত ছিল।

২০০৪ সালের প্রথম দিকে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার সাত মসজিদে তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়।

সে বৈঠকে তারা তারেক রহমান এবং লুৎফুজ্জামান বাবরের সাথে দেখা করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

রাষ্ট্র-পক্ষের কৌসুলি মোশারফ হোসেন কাজল জানালেন, মামলার অভিযোগপত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে।

মামলার অভিযোগ-পত্রের কথা উল্লেখ করে মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, "মাওলানা তাজউদ্দীন তাকে (মুফতি হান্নান) আব্দুস সালাম পিন্টুর কাছে নিয়ে যায়। আব্দুস সালাম পিন্টু লুৎফুজ্জামান বাবরের কাছে যায়। তখন লুৎফুজ্জামান বাবর এবং কায়কোবাদ মিলে হাওয়া ভবনে আসে"

মি: কায়কোবাদ তখন কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন।

মুফতি হান্নান তাঁর জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, হাওয়া ভবনের বৈঠকে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, ডিজিএফআই-এর তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এবং ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুর রহিম উপস্থিত ছিলেন।

তাদের উপস্থিতির কিছুক্ষণ পর তারেক রহমান সেখানে আসেন। এমনটাই জানা যাচ্ছে আদালতে দেয়া মুফতি হান্নানের জবানবন্দি থেকে।

মুফতি হান্নান এবং তার সহযোগীরা যাতে হাওয়া ভবনে আর না আসে সেটি জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, " আপনারা বাবর সাহেব এবং আব্দুস সালাম পিন্টুর সাথে যোগাযোগ করে কাজ করবেন।" এমনটাই জবানবন্দীতে জানিয়েছেন মুফতি হান্নান।

মুফতি হান্নান এবং মাওলানা তাজউদ্দীন বাংলাদেশকে উগ্র ইসলামপন্থী ধারায় পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মতো বানাতে চেয়েছিল বলে উল্লেখ করেন মামলায় রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল।

"তারা তারেক রহমানকে আশ্বস্ত করে যে আপনি সবসময় ক্ষমতায় থাকবেন," বলছিলেন মোশারফ হোসেন কাজল।

শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সাথে মুফতি হান্নান এবং তারেক রহমানের মিউচুয়াল ইন্টারেস্ট (পারষ্পরিক স্বার্থ) জড়িত ছিল বলে রাষ্ট্র-পক্ষ বলছে।

তিনি বলেন, "মুফতি হান্নানের সাথে হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের কথা হয়েছে, যোগাযোগ হয়েছে। এগুলো আমরা এভিডেন্সের মাধ্যমে এনেছি। এগুলো আমরা আদালতে প্রমাণ করতে পেরেছি"

"মুফতি হান্নান ভেবেছিল এভাবে ছোট-ছোট কাজ করে কোন লাভ হবে না। একবারে শেখ হাসিনাকে যদি হত্যা করা যায় তাহলে হয়তো বাংলাদেশে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারবে তারা," বলছিলেন মি: কাজল।

পাকিস্তানী নাগরিক মাজেদ ভাট এবং মাওলানা তাজউদ্দীন পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড এনে মুফতি হান্নানকে দিয়েছিল। আব্দুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে সে গ্রেনেডগুলো বিতরণ করা হয় বলে মামলা নথিপত্রে উল্লেখ আছে।

হামলার পর আলামত নষ্ট করে দেয়া এবং প্রকৃত আসামীদের আড়াল করার জন্য তৎকালীন সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা কাজ করেছেন বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবী।

মামলার নামে জজ মিয়া নামের এক নিরপরাধ ব্যক্তিকে জড়িত করা হয়।

ঘটনার পর মাওলানা তাজউদ্দীনকে ভুয়া পাসপোর্টের মাধ্যমে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে পাসপোর্টে তার নাম দেয়া হয়েছিল বাদল।

এ কাজের সাথে তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর কর্মকর্তা এটিএম আমিন এবং সাইফুল ইসলাম ডিউক জড়িত ছিল।

আদালতে এটি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবী।

মুফতি হান্নানসহ মোট ১৮জন আসামী এ মামলায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে। পরবর্তীতে ২২৫ সাক্ষী আদালতে এসেছে।

তাদের মাধ্যমে এ ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে বলে জানান রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবী।

বিবিসি



মন্তব্য