ঢাকা - নভেম্বর ২০, ২০১৮ : ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

যে কারাগারে শিশুরা ভোগে প্রাপ্তবয়স্কের সাজা

নিউজ ডেস্ক
সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮ ১৭:৩০
৩০১ বার পঠিত

অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপের দিক থেকে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে একটি অস্ট্রেলিয়া। প্রতিবছর দেশটিতে হাজারও অভিবাসীকে মানব-পাচারের অভিযোগে কারাবন্দী করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার সেইসব অভিবাসী কারাগারে গিয়ে দেখা যায় প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে শিশু-কিশোরদেরও আটকে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে।

আর এ বিষয়ে ওই শিশুদের স্বজনদেরও কিছু জানানো হয়নি।

মানবাধিকার কর্মীদের বিষয়টি চোখে পড়লে তারা আইনি লড়াইয়ে নামেন। আর তাতে বেরিয়ে আসে এমন কয়েকজনের দু:সহ অভিজ্ঞতার কথা।

তেমন একজনের মা সিটি রুডি। থাকেন ইন্দোনেশিয়ার রট দ্বীপের ওয়েলাবা গ্রামে। যার অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার বেশ কাছাকাছি।

তার ছেলে আবদুল একদিন কাজে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। সেটা ২০০৯ সালের কথা।

নিখোঁজ হওয়ার কয়েকমাস পর্যন্ত সন্তানের কোন খবর না পেয়ে সিটি রুডি ভেবেছিলেন তার ছেলে হয়তো সমুদ্রে ডুবে মারা গেছে। তারপর একদিন হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে।

"অনেকদিন পর আবদুল আমাকে ফোন করে। জানায় যে সে অস্ট্রেলিয়ায় আছে। সেখানকার কারাগারে। ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। দিন রাত শুধুই কেঁদেছি। কারণ ছোট ছেলে হিসেবে একমাত্র সেই আমার দেখাশোনা করতো।"

সে সময় ভাল বেতনের কারণে নৌকায় চাল আনা নেয়ার কাজ নিয়েছিলেন আবদুল। এই চাল কোথা থেকে আসে এবং কোথায় যায়, তার কিছুই জানতেন না।

এভাবে এক পর্যায়ে অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ তাকে সমুদ্র সীমার কাছ থেকে আটক করে এবং তাকে মানব-পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করে।

যারা কি না আশ্রয় প্রত্যাশীদের সমুদ্র পথে অবৈধভাবে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসে।

সে সময় আবদুলের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। অস্ট্রেলিয়া পুলিশ ওই বয়সেই তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

প্রাপ্ত বয়স্কদের আইন অনুযায়ি আদালত আবদুল দোষী সাব্যস্ত করে আড়াই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।

কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা যেই কারাগারে সব প্রাপ্তবয়স্ক আসামীদের সঙ্গে কিশোর আবদুলকে আড়াই বছর থাকতে হয়েছিল।

"শুরুর দিকে আমার অনেক ভয় লাগতো। আতঙ্কে থাকতাম, হয়তো আমাকে অনেক মারধোর করা হবে। কারণ সেখানকার সবাই আমার চেয়ে বয়সে আর অপরাধেও অনেক বড় ছিল। ধীরে ধীরে আমি কারাগারের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি ঠিকই তবে পরিবারের থেকে এতো দূরে এভাবে থাকা অনেক কঠিন ছিল।" জানান আবদুল।

হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মতো অস্ট্রেলিয়ার সীমান্ত আইন বেশ কড়া হলেও ২০০৯ সালে প্রচলিত সীমান্ত নীতি অনুযায়ী যদি সমুদ্র সীমায় উদ্ধারকৃত কোন আরোহী শিশু হয় তাহলে তাকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। কোন অভিযোগ দায়ের করা যাবেনা।

এগিয়ে এলেন অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন আইনজীবী

আবদুল এখন পরিণত যুবক। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে তারমতো ১২০ জনের বেশি শিশুকে অবৈধভাবে কারাবন্দি করেছিল অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে অস্ট্রেলিয়ার আইনজীবীরা আবদুলের গ্রামের বাড়িতে যায়।

আবদুলকে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে এখন তারাও একটি মামলা দায়ের করেছে যেন তারা মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী, অস্ট্রেলিয়া কমনওয়েলথ ও বয়স পরীক্ষার চিকিৎসকের থেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ের করতে পারে।

অস্ট্রেলীয় আইনজীবী মার্ক ব্যারো মনে করেন, কর্তৃপক্ষের থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যাপারে তারা যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে আছে।

"শিশু কিশোরদের এভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর কোন নিয়ম জাতিসংঘে নেই। তাকে তার পরিবারের সঙ্গে রাখাই নিয়ম।"

মিস্টার ব্যারো বলেন, "যদি কোন অস্ট্রেলীয় শিশু ইন্দোনেশিয়ায় আটকা পড়তো তাহলে দ্রুত তার পরিচয় শনাক্ত করে, শিশুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হত।"

কারাগারে নিপীড়ন:

কারাবন্দি শিশুদের অনেকেই শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল বলে জানতে পেরেছেন ওই আইনজীবীরা।

অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও অনেকে সেই মানসিক উদ্বেগ কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

যদিও সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে মুখ খোলেনি জেল ফেরতরা।

কলিন সিঙ্গার একজন স্বাধীন কারা পর্যবেক্ষক। তিনি জানান কিভাবে অস্ট্রেলিয়ার পার্থের একটি কারাগারে তিনি ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা এক শিশুর দেখা পান।

তিনি বলেন, "আমি অবাক হয়ে দেখলাম। ছোট একটি শিশু কারাগারের শিক ধরে আছে। আলী জেসমিনের সঙ্গে সেটাই আমার প্রথম দেখা। আমি তাকে দেখে হাসিমুখে নাম জানতে চেয়েছিলাম। দেখেছি তার চোখ জুড়ে অশ্রু আর আতঙ্ক।"

বারবার দুই দেশের কর্তৃপক্ষে দরজায় কড়া নাড়লেও কোন সাড়া মেলেনি।

পরে অনেক প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে ২০১২ সালে আলী জেসমিনকে কারাগারের বাইরে বের করে আনা হয়।

মিস্টার জেসমিনের এখন দুই বছর বয়সী মেয়ে রয়েছে। শৈশব জেলে কাটানোয় পড়াশোনা আর করতে পারেননি। এখন মাছ ধরাই তার জীবিকা।

মিস্টার সিঙ্গার অভিযোগ অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ জেনে-বুঝে ইচ্ছা করে জেসমিনের মতো আরও অনেককে গ্রেফতার করেছে। তিনি বলেন,

"বিশ্বাস হতে চায় না যে একটা ১৩ বছর বয়সী শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে রাখা হয়েছে। কয়েকদিন বা সপ্তাহের জন্য নয়, প্রায় তিন বছর ধরে। শুধু একজনের সঙ্গে না। এমন বহু শিশুর সঙ্গে তারা এই কাজ করেছে। বিশ্বাসই হতে চায় না।"

দুই দেশের কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

এই শিশুদের আইনের মাধ্যমে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিস্টার সিঙ্গার।

কারাবন্দিরা যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল সেটার তথ্য প্রমাণ কেন সংগ্রহ করে আইনী লড়াইয়ে যাওয়া হল না

এমন প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন ইন্দোনেশিয়ার কনসাল জেনারেল এবং বর্তমানে মরোক্কোর দূত দেদে সিয়ামসুরি বলেন, "আমাদের পক্ষে যতোটুকু সম্ভব ছিল আমরা বয়স সংক্রান্ত কাগজপত্র অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষকে দিয়েছিলাম। কিন্তু দিন শেষে সবই নির্ধারিত হত তাদের মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ি। অস্ট্রেলিয়ার মেডিকেল রিপোর্টে সবাইকে প্রাপ্ত বয়স্ক দাবি করা হয়েছে। আমাদেরও সেটা মেনে নিতে হয়েছিল।"

তবে তাদের প্রতিনিধিরা প্রতিদিন ওই শিশুদের খোঁজখবর নিতে কারাগারে যেতেন বলে তিনি জানান। কারাগারে তাদের খেলাধুলার পাশাপাশি টেলিভিশন দেখার সুবিধা দেয়া হতো বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে তিনি এটাও জানান যে তার কাছে কারাগারে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের খবরও তিনি পেয়েছেন। এ কারণে তিনি শিশুদের অন্য কারাগারে পাঠাতে অস্ট্রেলিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধও জানান।

তবে তার এমন দাবিতে ক্ষোভ জানিয়েছেন মিস্টার জেসমিন। তার দাবি, নিজ দেশের কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে সুবিচার পেতে তাদের এতোটা কালক্ষেপন করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোন সাক্ষাতকার দিতে বা মন্তব্য করতে রাজী হননি।

কেউ পেয়েছেন সাফল্য, কেউবা মৃত্যু:

তবে গত বছর প্রথমবারের মতো আলী জেসমিনের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেয়া সম্ভব হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার আপিল আদালতের তথ্যে তার বিরুদ্ধে বিচারে ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে আলী জেসমিন বলেন, "সুবিচারের জন্য আমার লড়াই সার্থক হয়েছে। এটা একটা ভাল খবর। আমাকে দীর্ঘসময় কারাগারে বন্দি রাখার জন্য আমি এখন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ে লড়াই করছি।"

তিনি এই ক্ষতিপূরণ মামলার প্রধান দাবিদার এবং এখান থেকে তিনি কোন অর্থ পেলে সেটা দিয়ে নিজের একটি ছোট ব্যবসা খুলে বসার কথা ভাবছেন। যেন পরিবারের দেখাশোনা করতে পারেন।

তার মতোই একজন আরউইন প্রায়োগা। সে আলীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার জেলে বন্দি ছিল।

তবে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার দুই মাসের মাথায় তিনি মারা যান। সব মিলিয়ে তার ক্ষতিপূরণের মামলা দায়েরেও দেরী হয়ে যায়।

ভাই বাকো আলী এখনও মৃত ভাইয়ের বন্দিজীবনের কষ্টের কথা ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তিনি বলেন, "ভাবতেও খুব কষ্ট হয় এই ভেবে যে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যখন সে আমাদের রটে দ্বীপের বাড়িতে ফিরে আসে। তখন সে কি ভীষণ অসুস্থ ছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম তার সঙ্গে কি হয়েছিল। সে জানায় যে যদি বন্দিরা অসুস্থ থাকে, তাহলে তাদের বাড়ি যেতে দেয়া হয়না। তাহলে ছাড়া পাওয়ার পর পর সে কেন অসুস্থ হয়ে পড়ল?"

প্রায়োগার পক্ষে ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা লড়তে এরিমধ্যে তার মেডিকেল রেকর্ড সংগ্রহ করেছেন আইনজীবীরা।

মৃত প্রায়োগার পরিবারের আশা তারাও এই ক্ষতিপূরণ পাবে। আর সেটা দিয়ে সবার আগে বাড়ির আঙিনায় তার জরাজীর্ণ কবরটিকে সংস্কার করবেন।

বিবিসি



মন্তব্য