ঢাকা - আগস্ট ২০, ২০১৯ : ৪ ভাদ্র, ১৪২৬

প্রাতিষ্ঠানিক চ্যারিটির সংস্কৃতি

নিউজ ডেস্ক
সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৮ ১৬:০৯
১৮৪ বার পঠিত

বাংলাদেশে মানবকল্যাণে কাজ করছে অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান। কিন্তু স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত অর্থসহায়তা যোগাড় করতে না পারায় এসব প্রতিষ্ঠানকে নির্ভর করতে হয় বিদেশি সহায়তার ওপর। আর যারা বিদেশি সহায়তা নেন না, তাদের কার্যক্রম আটকে থাকে নির্দিষ্ট একটা গণ্ডির ভেতরে।

বিশ্বের অনেক দেশেই সেভ দ্য চিলড্রেন, অক্সফাম বা এমএসএফের মতো এমন অনেক দাতব্য সংস্থা আছে, যেগুলো গড়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের অর্থসাহায্যে মানবকল্যাণের জন্য।

এ ধরণের সংস্থাগুলোকে সমাজে এমন অনেক বড় অবদান রাখতে দেখা যায়, যেটা অনেক সময় সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগেও করা হয়ে ওঠে না।

কিন্তু বাংলাদেশে কেন এমন অবস্থার সৃষ্টি হলো? এদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চ্যারিটির সংস্কৃতিই বা কতটা গড়ে উঠেছে?

ঢাকার ফরাশগঞ্জে একটি হিন্দু অনাথ আশ্রম। বিভিন্ন বয়সী ৯৫ জন অনাথ শিশু এখানে আশ্রয় পেয়েছে।

এসব শিশুর থাকা-খাওয়া, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল খরচ মেটানো হয় মূলত: ব্যক্তিগত অনুদানের মাধ্যমে।

তবে গত দুই দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে এক ধরণের সংকটের মধ্যে। কারণ অনাথ আশ্রমটি চালাতে পর্যাপ্ত অর্থ সাহায্য জোগাড় হচ্ছে না।

অনাথ আশ্রমের সহ-সভাপতি রণজিৎ কুমার বসু বলছিলেন, ''আমাদের এখানে অনেকে একবেলা খাবার দেয়। দেখা যায় বছরের বেশিরভাগ দিনেই অন্তত: একবেলা খাবার এভাবে আমরা পাচ্ছি। বিভিন্ন সময় কেউ কেউ পোষাকও দিয়ে থাকেন।"

"কিন্তু আমাদের তো আরো অনেক খরচ আছে। সেটা মেটানো যাচ্ছে না। টানাটানি লেগেই আছে।''

এই হিন্দু অনাথ আশ্রমটি স্থানীয়ভাবে যে সাহায্য সংকটে পড়েছে, বাংলাদেশের অনেক দাতব্য সংস্থাই সেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি।

তবে এদের অনেকেই পরিস্থিতি সামলাতে গ্রহণ করছে বিদেশি অনুদান।

এরকমই একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান ঢাকা আহছানিয়া মিশন।

একসময় পুরোপুরি দেশের সাধারণ মানুষের অর্থসাহায্যে যেই প্রতিষ্ঠানটি ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত করেছিলো, সেটিও পরে সেবামূলক কাজ অক্ষুন্ন রাখতে গ্রহণ করতে শুরু করে বিদেশি অনুদান।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এহসানুর রহমান বলেন,''যখনই আমরা বড় পরিসরে কাজ করতে গেলাম, বিভিন্ন জেলায় কার্যক্রম শুরু হলো তখন বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজন হলো এবং বিদেশি সংস্থাগুলোও এগিয়ে আসতে শুরু করলো।"

"এভাবেই আসলে আমরা বিদেশি অনুদানের দিকে ঝুঁকে পড়ি।''

মি. রহমানের মতে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবেই স্বেচ্ছাসেবা, অনুদান কিংবা চ্যারিটি কার্যক্রম ছিলো এবং এখনো আছে।

তবে গত শতকের আশির দশকে এদেশে যখন ব্যাপকভাবে বিদেশি অনুদান আসা শুরু হয়, তখন স্থানীয়ভাবে অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগে ভাটা পড়ে।

যদিও সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন মনে করেন, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে দাতব্য কাজে অংশ নেয়ার যে প্রবণতা সেটা সংগঠিত নয়। সে কারণে স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনগুলো সমস্যায় পড়ছে।

তিনি বলছিলেন, ''এখানে তো কোনকিছুই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হচ্ছে না। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ হয়তো কোন একটা এলাকায় একটা স্কুল, এতিমখানা কিংবা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করছেন।"

কিন্তু সেটার কার্যক্রম কিভাবে অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে দেয়া যায়, তার কোন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই বলে তিনি মনে করেন।

"সংগঠিতভাবে সাহায্য সংগ্রহেরও কোন উদ্যোগ নেই। এগুলো হয় অনেকটা একক বা কয়েকজন ব্যক্তির উদ্যোগে।''

তার মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যেও এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সহায়তা করার প্রবণতা কম। বরং বিচ্ছিন্নভাবে সবকিছু হচ্ছে। এতে অসহায়দের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।

তার কথার প্রমাণও পাওয়া গেলো।

ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে দেখা গেলো, কবরস্থানের মূল ফটকের সামনে জনা পঞ্চাশেক ভিক্ষুক জড়ো হয়েছেন সাহায্যের আশায়।

তাদের কেউ কেউ ভিক্ষা করছেন বেশ কয়েকবছর ধরে।

এ রকমই একজন পঞ্চাশ বছর বয়সী পঙ্গু নারী পেয়ারা খাতুন। তাঁর সঙ্গে কথা বলি।

উদ্দেশ্য ভিক্ষার টাকা তার ভাগ্য পরিবর্তনে কতটা কাজে লাগছে সেটা জানা।

পেয়ারা খাতুন বলছিলেন, ''ভিক্ষা কইরা প্রতিদিন যে আশি/নব্বই টাকা পাই, সেইটা তো পেটেই চইলা যায়। কোনরকমে বাইচা থাকন যায় আরকি। টাকাও জমাইতে পারি না।"

হাতে টাকা থাকলে কি করতেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "কোন দোকান দিতে পারতাম, তাইলে আর ভিক্ষা করা লাগতো না।''

সেখানেই কথা বলি মাহফুজুর রহমান নামে এক তরুণের সঙ্গে। যিনি হাতে থাকা গোটা পঞ্চাশেক টাকা ভাগ করে দিচ্ছিলেন কয়েকজন ভিক্ষুকের মধ্যে।

তার এই বিচ্ছিন্ন অর্থসাহায্য ভিক্ষুকদের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটা কাজে আসে?

''আসলে আমিও জানি এই টাকায় তাদের কিছুই হবে না। কিন্তু মনের শান্তির জন্যই দান করি।"

মি: মাহফুজ জানাচ্ছেন, "আমরা সবাই যদি বিচ্ছিন্নভাবে সবাইকে পাঁচ/দশ টাকা করে না দিয়ে সবাই মিলে টাকাগুলো একজায়গায় সংগ্রহ করে কয়েকজনকে দিয়ে দেই বা তাদের জন্য দোকান কিংবা ছোট ব্যবসার সুযোগ করে দেই, তাহলে সেটাই যথার্থ হবে।"

"কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কে উদ্যোগ নিবে? আবার উদ্যোগ নিলেও বিশ্বাসযোগ্যতারও তো ব্যাপার আছে।''

এক্ষেত্রে দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও সূদরপ্রসারি কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে-সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবা, অনুদান কিংবা মানব কল্যাণে কাজ করার প্রবণতা তৈরির উপর জোর দিচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন।

তিনি বলছিলেন, ''অনেক ক্ষেত্রে চ্যারিটি নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি হয়। এর ভিত্তিও আছে।"

"এজন্য সরকারিভাবে একটা নীতিমালা করা যেতে পারে। যেখানে বলা থাকবে চ্যারিটি সংস্থা কিভাবে গড়ে উঠবে, কিভাবে ডোনেশন নেবে, কিভাবে পরিচালনা হবে," বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।

মাহবুবা নাসরিনের মতে, বাংলাদেশ ক্রমেই অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করছে। ফলে ভবিষ্যতে এদেশে বৈদেশিক অনুদান কমে আসবে।

সেক্ষেত্রে এখন থেকেই স্থানীয়ভাবে দাতব্য সংস্থার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সরকার, দাতব্য সংস্থা কিংবা আগ্রহী নাগরিক সকলের মধ্যেই একটা সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।

বিবিসি



মন্তব্য