ঢাকা - ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ : ৪ ফাল্গুন, ১৪২৫

১৫ আগস্ট বাঙালির শোকের দিন

নিউজ ডেস্ক
আগস্ট ১৫, ২০১৮ ১১:২৪
২৩৪ বার পঠিত

১৫ আগস্ট আজ জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির শোক দিবস আজ। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় ১৯৭৫ সালের আজকের এই দিনে একদল পথভ্রষ্ট সেনাবাহিনী বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে।

কিন্তু যদি গীতিকার হাসান মতিউর রহমানের গানের কথা গুলো সত্যি হত। ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ উক্তিটি মিথ্যে না হত। যদি শোনা যেত ৬ ফুট উচ্চতার সেই মানুষটি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন! যদি ৭ই মার্চের মত প্রায়ই জনসভা করে এদেশের মানুষকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক মুক্তির জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। ন্যায় বিচার, সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বলতেন। আর মুক্তি পাগল বাঙালি যদি যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো দেশ গড়তে, তাহলে বিশ্ব মানচিত্রে খুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এক বাংলাদেশকে নিশ্চয়ই আমরা দেখতে পেতাম।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত দেশ গড়ার জন্য তিনি পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে ৩ বছরের একটু বেশি সময়। এই সামান্য সময়ে বঙ্গবন্ধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন। শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি কোনো সূচকেই বাংলাদেশ যেন পিছিয়ে না থাকে তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। দেশ স্বাধীনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে যখন তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন এক দল হায়েনা তাঁর দেশ গড়ার এ প্রচেষ্টা সহ্য করতে পারল না।

বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যিনি দেশ স্বাধীন করলেন, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গঠনে অপরিসীম অবদান রাখলেন তার প্রতিদান হিসেবে তিনি যা পেলেন তা নির্মম বললে হয়ত কমই হবে। একদল উচ্ছৃঙ্খল সেনাবাহিনী ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারসহ ১৬ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করল।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন সরলমনা ও একজন দেশপ্রেমি মানুষ। তিনি কখনও ভাবতে পারেননি যে জাতিকে জীবনের মূল্যবান ৪৬৮২ দিন জেলের নির্মম নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করে মুক্তির পথ দেখালেন, যাদের মুক্তির জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করলেন। তারাই ঘাতক হয়ে তাঁর গলায় ছুরি বসাবে। ঘাতকরা এতই পাষণ্ড ছিল যে দোতলা থেকে নেমে যখন শেখ কামাল তাদেরকে বলেছিলেন ‘তোমরা কারা আমি রাষ্ট্রপতির ছেলে শেখ কামাল।’ ঘাতকরা তার কথা শোনার সাথে সাথেই ব্রাশ ফায়ারে শেখ কামালের কণ্ঠ নিস্তব্ধ করে দিয়েছিল। জাতির পিতা নিজেও বিশ্বাস করতে পারেননি তাঁকে কেউ হত্যা করবে এজন্যই কঠিন মূহুর্তেও ঘাতকদের বলেছিলেন -'এখানে কি চাস তোরা, চলে যা'। সেদিন ঘাতকরা কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি হত্যা করেছিল বাংলাদেশকে। ঐদিনের কালো রাতে ঘাতকরা একে একে জাতির পিতার পরিবারের সদস্যসহ মোট ১৬ জনকে হত্যা করে। ১০ বছরের শিশু রাসেলের আর্তনাদ দেখেও সেদিন ঘাতকের কালো দিলে এতটুকু মায়াও জন্মায়নি। নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে এই অবুঝ শিশুটিকেও তারা হত্যা করে। ফুলের মত অবুঝ শিশুটি তার মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল কিন্তু মায়ের পরিবর্তে শিশুটিকে দেওয়া হলো বুলেট। একটি বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দেয় শিশু রাসেলের বুক।

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবন সেদিন রক্তে প্লাবিত হয়েছিল। ঘাতকরা সে রাতেই তড়িঘড়ি করে বঙ্গবন্ধুকে কবর দেবার জন্য গোপালগঞ্জের টঙ্গীপাড়ায় নিয়ে যায়। ঘাতকরা সিদ্ধান্ত নেয় গোসল ছাড়াই দাফন করবে। কিন্তু পরে জাতির পিতাকে দ্রুত গোসল করাতে বলে। ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করানো হয় বঙ্গবন্ধুকে। পার্শ্ববর্তী রেডক্রস হাসপাতাল থেকে রিলিফের সাদা কাপড় দিয়ে বানানো হয় কাফনের কাপড়। ৭ই মার্চে যে বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের ভাষণ শোনার জন্য রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষ জনতা ভীড় করেছিল ঘাতকের ভয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধুর জানাযায় অংশ নিয়েছিল মাত্র ৩০ জনের মতো মানুষ।

‘৭৫ পরবর্তী সময়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইমডেমনিটি আদেশ জারি করে জাতির জনকের খুনিদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। ‘৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দেবার জন্য সকল অপকর্মই অব্যাহত রাখে সামরিক জান্তারা। ২১ বছর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে ১২ নভেম্বর ১৯৯৬ সালে এ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেন।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী-বিবাদীর আপিলের প্রেক্ষিতে চার দফায় রায় প্রকাশ হয়। সর্বশেষ আপিল বিভাগ ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর ১৯ নভেম্বর ১২ জনের চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় ঘোষণা করেন। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) এর ফাসির রায় কার্যকর করা হয়। এছাড়ও এখনো ১২ জনের মধ্যে ৬ জন বিদেশে পালিয়ে আছে। পলাতকরা হলেন কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল মাজেদ। পলাতক আব্দুল আজিজ পাশা নামে পলাতক বঙ্গবন্ধুর খুনি ২০০১ সালে মারা যান।

জাতির জনকের পলাতক জীবিত ৬ জন আত্মস্বীকৃত খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। চতুর্দশ লুই খ্যাত জাতির জনককে হত্যার পর বাঙালিকে আর বিশ্বাস করা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম কবিতা লেখেন কবি অন্নদাশঙ্কর রায়। তিনি তাঁর কবিতায় বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এভাবেই লিখেছেন- 'নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরো বড়/ করে যদি তাঁর পুত্রসম বিশ্বাসভাজন'।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের ১৬ জনকে হত্যা করেই ঘাতকেরা থেমে থাকেনি। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁরই যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকেও ১৯ বার হত্যা করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছে ঘাতকরা। ১৫ আগস্টের একটি বুলেট প্রতিনিয়ত অনুস্মরণ করছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। সমস্ত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিক জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে দিন-রাত পরিশ্রম কাজ করে যাচ্ছেন।

৩২ নম্বর বাড়ির সিড়িতে পড়ে থাকা ১৮ টি বুলেট বিদ্ধ জাতির জনক ও তার পরিবারের রক্তের শোককে শক্তিকে পরিণত করে দেশ সেবা করে যাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বলেছিলেন- 'রক্তের দাগ এখনো শুকায় নি'। মুজিব হত্যার রক্তের দাগ বাঙালির হৃদয় থেকে কখনোই শুকাবে না। বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা এই মহান মানুষটির সমস্ত ত্যাগকে শক্তিতে পরিণত করে বাঙালি বিশ্ব মানচিত্রে একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই।

মোঃ রাকিবুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য