ঢাকা - জুন ২২, ২০১৮ : ৭ আষাঢ়, ১৪২৫

ন্যূনতম মজুরি হোক ১৯ হাজার ৫৯২ টাকা

নিউজ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৮ ১০:১৭
৫৪৭ বার পঠিত

আনিসুর রহমান এরশাদ

যে যত বেশি দামে বিক্রি হয় সেই তত বেশি মূল্যবান কিনা তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক যাই থাকুক, দেশবাসী চায় ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হোক। অথচ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে সর্বনিম্ন মজুরি বাংলাদেশে। ১৯৮৫ সালে ছিল ৫৪২ টাকা, ১৯৯৪ সালে ৯৩০ টাকা, ২০০৬ সালে ১৬৬২ টাকা, ২০১০ সালে ৩ হাজার টাকা। ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়। এর মধ্যে মূল মজুরি ৩ হাজার টাকা, বাড়ি ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা এবং চিকিৎসা, যাতায়াত ও খাদ্য ভাতা ১ হাজার ১০০ টাকা। এন্ট্রি লেভেলে একজন শ্রমিক নিম্নতম পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন। ষষ্ঠ গ্রেডে ৫ হাজার ৬৭৮ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৬ হাজার ৪২, চতুর্থ গ্রেডে ৬ হাজার ৪২০, তৃতীয় গ্রেডে ৬ হাজার ৮০৫, দ্বিতীয় গ্রেডে ১০ হাজার ৯০০ ও প্রথম গ্রেডে ১৩ হাজার টাকা নূ্যনতম মজুরি নির্ধারিত আছে। এ ছাড়া বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া বাধ্যতামূলক। বর্তমানে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার টাকা, আর বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা মিলায়ে সর্বমোট ১৬ হাজার টাকার দাবি করেছে।

একজন শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করে অর্জন করা অর্থ দিয়ে পরিবারের চারজন সদস্যের ভরণ-পোষণ চালাতে পারেন- এমন মজুরি তাকে দিতে হবে। যাতে শ্রমিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকতে পারে। ইতোমধ্যে জাহাজ ভাঙা শিল্পে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। অথচ ১৯৮৩ সালে নির্মাণ শ্রমিকদের নিম্নতম মূল মজুরি মাসিক ৩২০ টাকা এবং বর্তমানে নির্মাণ শ্রমিক নিম্নতম মূল মজুরি মাসিক ৬৯৫০ টাকা। পোশাক শিল্পের ন্যূনতম মজুরিও অত্যন্ত মানবেতর পর্যায়ে রয়েছে। একজন পোশাক শ্রমিকের মাসিক ন্যূনতম খরচ হচ্ছে ৪৮৯৮.৭৯ টাকা। একটি গবেষণায় দেখা যায়: খাদ্য বাবদ ২০৫৬.৪৪ টাকা, বাড়ি ভাড়া ৭৫৩.৩৩ টাকা, জামা কাপড় বাবদ ৩৫২.৫০ টাকা, চিকিৎসা খরচ ৪১৫ টাকা, কর্মস্থলে যাতায়াত বাদ ৩০৬.৬৭ টাকা, বিশ্রাম ৬০ টাকা, উৎসব ও অতিথি আপ্যায়ন ৪৭২ টাকা ও অন্যান্য ৩১০ টাকা ফলে একজন পোশাক শ্রমিকের সংসারে যদি ৪ জন সদস্য থাকে তবে নির্ধারিত নিম্নতম মজুরি হিসাবে ওই পোশাক শ্রমিকের বেতন হওয়া উচিত ১৯ হাজার ৫৯২ টাকা। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির আলোক পোশাক শ্রমিকদের দাবিকৃত বেতন ১৬,০০০ টাকা মোটেই বেশি নয়।

২০১৩ থেকে ২০১৮র মধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ সব কিছুর দাম অনেক বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। চালের কেজি ৬০ টাকা, পেয়াজ ১২০ টাকা। ৩ হাজার টাকা ভাড়ার বাসা ৬/৭ হাজার টাকা হয়েছে। শ্রমিকরা ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারেন না, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা করাতে পারেন না। যে বেতন পান, তা দিয়ে সংসার চালানো বড্ড কঠিন। শ্রমিকদের বেশিরভাগই একটি ঘরে একাধিক জন করে থাকেন। অনেকেই টিনের চাল দেয়া বাড়িতে থাকেন, যেখানে পানির সুব্যবস্থা নেই। যে বেতন পান তা দিয়ে অতি জরুরি প্রয়োজন মেটানোও খুব কষ্টকর। বস্তিতে থাকা শ্রমিকের বেশিরভাগ পরিবারকেই অন্য পরিবারের সঙ্গে টয়লেট ও ট্যাপের পানি ভাগাভাগি করতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওভারটাইম করা সত্ত্বেও মাসে তাদের সর্বোচ্চ আয় ৮ হাজার টাকা। একদিকে অনুন্নত কর্মপরিবেশ, অন্যদিকে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবিকা নির্বাহের অসামর্থ্য- সব মিলিয়ে কঠিন অবস্থা।

অনেক সময় শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বা মজুরি নিয়োগকারী মালিক তার নিজ ইচ্ছামত নির্ধারণ করেন, কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি মানেন না। নিয়োগপত্র দেন না, আইডি কার্ড পর্যন্তও দেন না; ফলে যখন-তখন ছাটাই করতে পারেন। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত কে করবে? কয়জন শ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা আছে? আর শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থ সংরক্ষণে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে শ্রমিক সংগঠনগুলো! যখন শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিক্ষোভ দমন করে। কিন্তু শ্রমিকদের অভুক্ত রেখে যারা কারখানা চালাতে চান, তারা মনেও রাখেন না শ্রমিকরা ভালো থাকলে উৎপাদন বাড়বে, প্রাত্যহিক ব্যয় নির্বাহ না হলে তার মন-শরীর ভালো থাকবে না।

উৎপাদনের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের এক ধরনের মজুরি; কর্মচারীদের আরেক ধরনের মজুরি তথা বেতন কাঠামোতে বৈষম্য আগেও ছিল, এখনো আছে। শ্রম আইনের ১৪১ ধারা অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণে জীবন যাপনের ব্যয়, জীবন যাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে দেখার কথা। অনেকেই জীবনযাত্রার খরচ, শ্রমিকের এবং তার পরিবারের চাহিদা, উৎপাদনের খরচ, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের দাম, ভোক্তা মূল্য দিতে নিয়োগকারীদের ক্ষমতা, দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা, মুদ্রাস্ফীতির হার বিবেচনা করেন না। মালিকের আশেপাশে যারা থাকেন, তাদের অনেকেই তোষামুদ এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলে এতটা নিমগ্ন থাকেন যে-শ্রমিক তথা অধীনস্ত শ্রেণির জন্য কিছু করার মতো মানসিকতাও পোষণ করেন না। মালিককে বা বোর্ডকে খুশি করার জন্য তাদের কথামত সুপারিশ করে থাকেন।

শ্রমিক বেতন পেলে সে টাকা দেশেই খরচ করে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ে। যে দেশের শ্রমিকদের মজুরি যত বেশি সে দেশ তত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত। চার-পাঁচ হাজার টাকা বেতনের একজন দরিদ্র শ্রমিক মানে দুর্বল শ্রমিক, তার কাছে বেশী উৎপাদন আশা করা বোকামী। দুর্বল শ্রমিকের সন্তান শারীরিকভাবে দুর্বল এবং অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই সকল শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো প্রয়োজন। বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে জীবনধারণের মতো মজুরি তাকে দিতেই হবে। শ্রমিকের শ্রম যত বেশি শোষণ করা যায়, ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা যায়; তত বেশি মুনাফা হয় মালিকদের। তাই দ্রব্যমূল্য কয়েকগুণ বাড়লেও তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতা বাড়াতে চান না মালিকরা। অথচ শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে দেশের উৎপাদন হয়, বৈদেশিক মুদ্রা আসে। তাই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি বিবেকবান গণতন্ত্রমনা মানুষের দায়িত্ব।

লেখাটি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে



মন্তব্য