ঢাকা - সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮ : ৯ আশ্বিন, ১৪২৫

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প উন্নয়নে ক্রেতা গোষ্ঠীদের ভূমিকা

নিউজ ডেস্ক
নভেম্বর ১২, ২০১৭ ২১:০৭
৫৩২ বার পঠিত
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান মেরুদন্ড হচ্ছে তৈরি গার্মেন্টস শিল্প। বর্তমান বাংলাদেশ ২৮.১৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার পোশাক রপ্তানি করে যা মোট রপ্তানির প্রায় ৪০.৬ শতাংশ। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পূর্ণভাবে ক্রেতা নির্ভর কারণ বাংলাদেশের কেবল ক্রেতাদের কাছেই পোশাক বিক্রি করে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে নয়।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভেল্যু চেইন নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, বাংলাদেশী একজন রপ্তানিকারকের মাত্র ১২-১৪ শতাংশ পণ্যের ভেল্যু চেইন এ অংশ গ্রহন করে থাকে বাকি গুলোর সিংহ ভাগই থাকে ব্যান্ডের খুচরা বিক্রেতা, ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানি ও পাইকারি ক্রেতা গোষ্ঠির কাছে।

তাছাড়া,বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা সুতা,ইয়ার্ন,কাপড়,সহ বিভিন ধরনের পণ্য বিভিন্ন দেশে আমদানি করে থাকে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা গোষ্ঠীদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চালিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে টেকসই ও মান সম্পূর্ণ একটি ভ্যলু চেইন বজায় রাখা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর এটি করতে পণ্যের ভ্যালু চেইনের সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেক নেতাকে দায়িত্বের সাথে কাজ করা প্রয়োজন।

এটা দৃশ্যমান যে, প্রত্যেক ক্রেতাই পণ্যের ভেল্যু চেইনের অধিকাংশ দখল করে থাকে। ফলে রেডিমেট গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিসের জন্য সকল বায়ার ব্রান্ড, গার্মেন্টস মালিক, প্রাইভেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকবৃন্দ সহ সকলের একত্রিত হয়ে দায়িত্ব ভাগাভাগির ভিত্তিতে এই খাতের উন্নয়নে এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা ভবিষ্যতে একটি সঠিক মানদণ্ড ও মডেল হিসিবে পরিগণিত হতে সাহায্য করবে।

বর্তমানে তৈরি গার্মেন্টস শিল্পের প্রধান সমস্যা হচ্ছে পণ্যের মূল্য পূর্বেকার থেকে বর্তমানে প্রায় প্রতি নিয়তই কমে যাচ্ছে। অপরদিকে বর্তমানে ফ্যাক্টরি গুলোকে কারেক্টিভ অ্যাকশন প্লানের আওতায় প্রায় কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে এক একটি ফ্যাক্টরির প্রায় ৭-৮ কোটি টাকা খরচ হয়ে থাকে একই সাথে পণ্য দ্রব্যের মূল্য দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ২০১৩ সালের নূন্যতম শ্রমিক মজুরি অনু্যায়ী প্রত্যেক বছরই শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি তাদের আসলের ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে এবং এরই জের ধরে, প্রত্যেক শ্রমিকেরই প্রথম চার বছর বিশ শতাংশ মজুরী বৃদ্ধি পেয়েছে। অপর দিকে পণ্যের মূল্য কমে যাছে, উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, ২০১৫ সালে যেখানে প্রতিটি লেগিংস (ওমেন্স ওয়্যার) এর মূল্য ছিলো ১.৯৪ ইউএস ডলার করে যে বিদেশী ক্রেতা পণ্যটি ক্রয় করত সেখানে একই ক্রেতা সেই পণ্যের মূল্যমান কমিয়ে পরের বছর ১.৭০ ইউএস ডলার দামে ক্রয় করতে প্রস্তাব রাখছে। আমেরিকা ও ইউকে’র পোশাক বাজারে যখন পোশাকের মূল্য ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করেছে ঠিক তখনই স্থানীয় বাজার গুলোতে তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে ফলে গার্মেন্টেস মালিকদের পক্ষে ফ্যাক্টরি কার্যক্রম চালু রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

গার্মেন্টস শিল্পের অপর একটি বড় সমস্যা হচ্ছে বায়ারদের পোশাক কেনার ক্ষেত্রের অডিট। কারণ আমাদের দেশীয় গার্মেন্টস সমূহকে প্রায় প্রতি বছরই ১০ থেকে ১২ বার নিরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। যার ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন ব্যান্ড এবং বিভিন্ন ধরনের বায়ার গোষ্ঠীর নানান ধরনের নিরীক্ষার (অডিটের)সম্মুখীন হতে হয় আমাদের দেশীয় পণ্যের গার্মেন্টস মালিকদের। তাই এটি গার্মেন্টস মালিকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন বিভিন্ন ধরনের মালিকদের বিভিন্ন ধরনের আবদার রক্ষা পূরন করা। যার জন্য গার্মেন্টস মালিকদের অতিরক্ত লোকবলের প্রয়োজন হয় এই ধরনের নিরীক্ষা পরিচালনার জন্য। শুধু তাই নয় এর সাথে সাথে মালিক গোষ্ঠিদের তার তৈরিকৃত প্রতিটি পণ্যের জন্য গুনতে হয় দ্বিগুন উৎপাদন মূল্য।

তবে প্রতি পণ্যের পেছনের এই উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব যদি আমরা প্রতিটি গার্মেন্টসের জন্য একই ধরনের ইউনিফাইড কোড ব্যবহার করতে পারি। আর এই ইউনিফাইড কোড ব্যবহার করার মাধ্যমে রেডিমেন্ট গার্মেন্টস খাতে বিদেশী ক্রেত গোষ্ঠী আরো বেশি দেশীয় পণ্যের সাথে সম্পৃক্ত হবেন যাতে করে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি টেকসই ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, বিদেশী ক্রেতাগোষ্ঠীদের সাথে মালিকপক্ষ ও খুচরা বিক্রেতার সম্পর্ক সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠলে একটি সুন্দর বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

বাস্তবিক অর্থে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়নে সকারি ও গার্মেন্টস মালিকগোষ্ঠির পাশাপাশি বিদেশী ক্রেতা সংগঠন সমূহকেও এগিয়ে আসতে হবে, কেননা কারো একার পক্ষে উদ্ভূত উপর্যুক্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সম্বলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল সম্ভব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।

লেখক, মো: সহিদুল ইসলাম ও তাসনিয়া তাবাসসুম

এম ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য