ঢাকা - জুন ১৯, ২০১৮ : ৪ আষাঢ়, ১৪২৫

জনসেবার নামে নিজের সেবা

নিউজ ডেস্ক
অক্টোবর ২৮, ২০১৭ ১৮:১০
১৪৭ বার পঠিত
আনিসুর রহমান এরশাদ

আমি বলছি না যে, আপনাকে জনসেবক-জনদরদী-জননেতা হতেই হবে; আমি বলছি, আপনি সেবার নামে প্রতারণা বন্ধ করুন। জনসেবার নামে রাজনীতি করেন কিংবা এনজিও খোলেন তা দ্বারা মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করুন। অনিয়ম করে, দুর্ভোগ বাড়িয়ে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আইন-শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে, অন্যায় আত্মস্বার্থ লাভে প্রয়াসী হয়েও সৎ-ভালো মানুষের ভান করবেন না। ঝোপ বুঝে কোপ মারার ধান্ধাবাজী-গা ঢাকা দিয়ে চলার চতুরতা ছাড়ুন, নানা কৌশলে প্রতারণা বাদ দিন, সুযোগ সন্ধানী হবেন না।

মুখে মানবপ্রেমী দাবি না করে কাজে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য হোন। প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে, অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পরের অর্থ নিজে আত্মসাৎ করে কলুষতা ছড়াবেন না, দ্রুত ভাগ্য বদলের আশা জাগিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিবেন না। আপনার অযত্ন-অবহেলা-উপেক্ষা যেন অন্যের দুর্ভোগের কারণ না হয়। দু’ পয়সার লোভে অন্যকে ঠকানো, স্বার্থের জন্য ‍অন্যের জীবনকে বিপন্ন করা সর্বাত্মকভাবে বর্জন করুন। মিথ্যার বেসাতি আর প্রলোভন ছাড়ুন, আশ্বাস ভঙ্গ করবেন না, অঙ্গীকার করলে কথা রাখুন, অস্বচ্ছতা-দুর্নীতির আশ্রয় নেবেন না। যেকোনো উপায়ে সফল হবার কথা না ভেবে সার্থকতার কথা ভাবুন, সবার আগে মানুষ হোন।

মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হওয়ার মধ্যেই শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নিহিত। সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অব্যবস্থাপনার সংস্কার সাধনে আত্মনিয়োগ করাতেই মঙ্গল। শুধু নিজের কল্যাণকে সুনিশ্চিত করতে পারে জনসেবার নামে নিজের সেবা করেন এমন মানুষেরাই। আব্রাহাম লিংকন যেভাবে নিজের সন্তানের শিক্ষককে সম্মান দিয়ে চিঠি লিখেছেন, বাদশাহ আলমগীর যেভাবে ছেলের ওস্তাদের কদর করেছেন; আজকাল কয়জন অভিভাবক সন্তানের শিক্ষকদের সেভাবে সম্মান করেন! সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন দিয়ে আর ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়িয়ে যেভাবে বাবা-মা তৃপ্তির ঢেকুর গিলেন তাতে মনে হয় লোকমান হেকিম অযথাই সন্তানকে এত পরামর্শ দিতেন! ‍

আপনি যদি চাকরির জন্য ঘুষ দেয়াকে অন্যায় মনে না করেন তবে চাকরি নিতে করা খরচ তুলতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুষ নিলে তা ন্যায় মনে করবেন না কেন! অধীনস্তদের প্রতি অবিচার করেও উর্ধ্বতনদের কাছে ইনসাফপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশাকারী যেমন, হারাম সুদের সাক্ষী-লেখক-গ্রহিতা-দাতা হয়েও স্রষ্টার সন্তুষ্টি আশাকারী তেমন। মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি, হাতে তসবিহ, নীচে জায়নামায রাখা যতটা কঠিন; তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন অর্ধজাহানের শাসক ওমরের (রা:) মতো ধুলোর তখতে বসে জীবন কাটানো। মক্কা-মদীনা গমণ কিংবা হজ-কুরবানী-যাকাত দান যতটা কঠিন তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন হযরত আবু বকরের (রা:) মতো সব সম্পদ বিলিয়ে দেয়ায়।

যে সম্পদ আহরণের জন্য সুদী ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকা কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে ঘুষ দেয়াকে বৈধ বলে মেনে নিয়েছেন তারপক্ষে সম্ভব নয় সম্পদ-স্বজন-সম্মান ভুলে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকারীদের মতো জীবন কাটানো। যাদের নিরাপত্তার জন্য বডিগার্ড বা স্পেশাল ফোর্সের প্রয়োজন হয় তাদের পক্ষে মহাত্মা গান্ধীর মতো ট্রেনে সাধারণ যাত্রীদের সাথে ভ্রমণের আনন্দ নেয়া সম্ভব নয়। ভোটের জন্য বা জনসমর্থনের জন্য কোটি টাকা ব্যয়েও যিনি কার্পণ্য করেন না তিনিই যদি রিক্সাচালক-ফুটপাথের দোকানদারের কাছ থেকে চাঁদা নেয়াকে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের জন্য বৈধতা দেন তবে তা বড়ই বেমানান দেখায়। আপনি মসজিদে-এতিমখানায়-ওয়াজ মাহফিলে দানও করবেন আবার ত্রাণের টাকা মারবেন এটা কেমন কথা! ‍ জনপ্রিয়তা পাবার চেয়ে সৎ হওয়ায় মনোযোগ দিন, দয়া-দাক্ষিণ্য-করুণার চেয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিন। একজনের চোখে অশ্রু ঝরিয়ে আরেকজনের মুখে হাসি ফোটানোর দরকার নেই।

দুর্নীতির অবারিত সুযোগ থাকার পরও দুর্নীতিমুক্ত থাকা তার জন্যই সম্ভব যে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মতো শোয়ার খাট না থাকায় ফ্লোরে পুরনো কার্পেটের উপর বালিশ বিছিয়ে ঘুমাতে পারেন, ডাইনিং টেবিল না থাকায় কার্পেটেই বসে খেতে পারেন, প্রাইভেটকার না থাকায় পাবলিক বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও গন্তব্যে যেতে পারেন, সামর্থ্য না থাকায় কমলা-আপেল-কলা -ছোট এক টুকরো কেক দিয়েই ছেলের বিয়েতে অতিথিদের আপ্যায়ন করতে পারেন, অফিসে যাওয়ার সময় সাথে করে স্ত্রীর হাতে বানানো দুপুরের খাবার ব্যাগে করে নিয়ে যেতে পারেন, দারোয়ান-পথচারী-সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে ও সুখ-দুঃখ শেয়ার করতে পারেন, প্রতিদিন মাত্র ৩ ঘন্টা ঘুমায়েই সুস্থ থাকতে পারেন ।

অনেকেই অনুকরণীয় কাজ কম করেন কিন্তু ভালো কথা বেশি বলেন। প্রকৃত সৎ ও যোগ্য মানুষের মুখে বেশি নীতি-আদর্শের কথা বলার প্রয়োজন কম হয়। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শের পরও দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে যদি রাষ্ট্রপ্রধান অসম্মতি জানান তবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার যে উন্নতি হবেই তার প্রমাণ মালয়েশিয়া ও মাহাথির মুহাম্মদ। নেতার বাসার আসবাবপত্র থেকে শুরু করে ব্যবহারের সিঁড়িটাও যদি স্বর্নের হয়, ভোগ-বিলাসের উপকরণ যদি পর্যাপ্ত থাকে, গরিবকে শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ার বাসনা থাকে, নীতি-নৈতিকতার চেয়ে আরাম-আয়েশকেই প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতা থাকে, জনপ্রিয়তা-স্বীকৃতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা থাকে তবে কর্মী-সমর্থকরাতো স্বার্থপর হবেই।

কোনো ব্যাপারে শুধু কামনা বা আশা পোষণে সীমাবদ্ধ থেকে সক্রিয় পদক্ষেপ না নেয়ার অর্থ হচ্ছে- বীজ না লাগিয়েই গাছ থেকে ফল খাবার আকাঙ্ক্ষা। আপনি নির্যাতিতকে দেখে চোখের পানিও ফেলবেন, আবার নিজেই নিপীড়কও হবেন এটা কেমন কথা! বলবেন শোষিত গণমানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে দায়িত্বশীল হতে হবে আবার গৃহে গৃহকর্মীকে যা খাবেন তা খাওয়াবেন না, সন্তানের পোশাক আর তাঁর পোশাকে বৈষম্য করবেন এটা কেমন কথা! মানুষের মুক্তি-সমতা-বৈষম্যহীন সমাজের জন্য রাজপথে বক্তৃতা দিবেন আর কাজের ছেলে কিংবা কর্মচারীকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করবেন এটা সভ্যতা নয়!

গণমানুষের কল্যাণ প্রতিষ্ঠার ব্রত না থাকলে, সুন্দর চেতনার ধারক-বাহক না হলে নি:স্ব- অসহায়-নির্যাতিত-দু:খী মানুষের কষ্ট-যন্ত্রণা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা যাবে প্রকৃত মানব সেবা হবে না। আপনি পুঁজিবাদীও হবেন আবার সবার সুখ-শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক চাইবেন- এটা হতে পারে ‍না। আপনি মানুষের প্রতি জুলুম করবেন আর স্রষ্টার কাছ থেকে কৃপা-অনুগ্রহ ‌আশা করবেন এটা যৌক্তিক হবে না। কত দামি ব্রান্ডের পণ্য-দ্রব্য ব্যবহার করেন, মূল্যবান জায়গায় বিচরণ করেন, জগৎটাকে কত বেশি উপভোগ করেন; তা দিয়ে যদি আপনার সামাজিক মর্যাদা বা সাফল্য বিচার-বিবেচনা হয় তবে আপনার পক্ষে নির্লোভ-নির্মোহ-নিরপরাধ মানুষ হওয়া সম্ভব নয়।

মানুষের প্রকৃত কল্যাণকামী ও সহায় যারা তারা পুঁজিবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদী হতে পারে না। অধিক মুনাফা ও সাম্রাজ্য বিস্তারের লোভে অসহায়কে আরো অসহায়, মজলুমকে আরো মজলুম, জালিম–অত্যাচারীকে সহায়তা, শোষণক উপভোগ আর শোষিতের কান্নাকে আনন্দের উৎস হিসেবে নেয়া ঠিক না। জুলুম–নির্যাতনের পথ মুক্তির পথ নয়; এতে দুর্বলের জন্য দুনিয়াটা হয় কারাগার আর সবল হয় বিবেকের কারাগারে বন্দী। জালেমের জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়নের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে পুঁজিবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদী। একজন যুক্তিবাদী মানুষ নিজের উপার্জন থেকে অন্যের জন্য ব্যয় করার যৌক্তিকতা খুঁজে নাও পেতে পারেন, সমস্ত সম্পদ বা উপার্জন আত্মভোগেও ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু একজন সামাজিক মানুষ, মানবিক মানুষ, বিশ্বাসী মানুষ শুধু আত্মভোগে প্রয়োজনীয় ভোগ করে আর জনকল্যাণে ব্যয় করে।

প্রতারকরা আছে সব পেশায়, ঘরে–বাইরে, দেশে–বিদেশে সর্বত্র। আহসান হাবীব পেয়ার মানবতাকে পুঁজি করে প্রতারিত করছে সাধারণ মানুষদের। ইফরীত জাহিন কুঞ্জ অসহায় মানুষদের সরলতার সুযোগ নিয়ে একের পর এক প্রতারণা করেছে। জনসেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে জনগণকেই শুষে খাওয়ার কৌশল আর মানুষের জীবন নিয়ে খেলা আমরা অনেক দেখেছি। শিক্ষা বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, কোচিং বাণিজ্য, চিকিৎসা বাণিজ্য, ক্ষুদ্রঋণের নামে সুদী কারবার, ক্ষমতার লিপ্সায় বিবেক বর্জিত ধোঁকাবাজি, সাইনবোর্ড সর্বস্ব সমিতি দেখেছি। এসব জনসেবা জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন না করলেও ফেরায়েছে অনেকের ভাগ্য, বাড়ায়েছে জনহয়রানি, পকেট কেটেছে নিরীহ মানুষের। এই যে জনসেবার নামে জনগণকে বঞ্চনার প্রচেষ্টা, প্রহসন, অপসেবা, ছলচাতুরী, স্বার্থসিদ্ধি, ব্যবসা, যা ইচ্ছে তাই কর‍া– এসব বন্ধ করতে হবে।

 


মন্তব্য