ঢাকা - মে ২২, ২০১৮ : ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এতো আগ্রহ কেন?

নিউজ ডেস্ক
জুন ১০, ২০১৬ ০০:২৬
০ বার পঠিত

bf726591-5365-4629-ab10-2c60e92bdb80বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন (ইসি)। বুধবার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (ইপি ) বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর একটি গতির উপর একটি সংলাপের আয়োজন করে। এতে বিদেশী নাগরিক , প্রকাশক, ব্লগার এবং একটিভিস্ট, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা , রিপোর্ট বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জাতীয় সংলাপ এবং অন্যান্য বিষয় তদন্তের উপর আক্রমণের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে ধরা হয়। তবে বাংলাদেশকে নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এমন সংলাপের আয়োজন করায় অনেক বিশেষজ্ঞ ইসির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ইপির ঠিক হয়নি।


সংলাপে নেদারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সাব কমিটির ভাইস চেয়ারমেন বার্ট কোয়েন্ডার্স বলেন, বাংলাদেশ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভালো সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন নিয়ে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ইইউ সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। তবে দেশটির উদ্বেগজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নের অন্তরায়। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।


তিনি আরও বলেন, সময় এসেছে বাছবিচারহীনভাবে গ্রেপ্তার বন্ধ, বাকস্বাধীনতা ও সব নাগরিকের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার। দেশটিতে চলতে থাকা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হতে হবে। দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরায় সংলাপে বসার।


ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ক প্রতিনিধিদলের ভাইস চেয়ার নিলা গিল বলেন, অন্তত ১০ জন সেকুলার অ্যাক্টিভিস্টকে হত্যা করা হয়েছে ঠান্ডা মাথায়। এসব হামলার দায় আল কায়দা ও আইসিস স্বীকার করলেও, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এসব গোষ্ঠীর অবস্থান অস্বীকার করে যাচ্ছে। ঝুঁকির মুখে থাকা মানুষদের সুরক্ষা দেয়ার পরিবর্তে, সরকার এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে সহিংসতায় নিমজ্জিত হতে দিতে পারি না।


পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য চার্লস ট্যানক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সরকার নয়, দায়ী কট্টরপন্থীরা। ইউরোপিয়ান ইউনয়নের উচিৎ সমালোচনা কম করে, সহযোগিতা বেশি করা। ম্যারিয়েট শাকে বলেন, জনগণকে রক্ষার জন্য সরকারের সাধ্যমত সবকিছু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্লামেন্টকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইস্যুতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতৃত্ব যথেষ্ঠ বলিষ্ঠ ছিল না। ইইউ এ নিয়ে যথেষ্ট বক্তব্য রাখেনি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেন আমরা বাংলাদেশ ইস্যুতে পর্যাপ্ত বিবৃতি দেখিনি?


c7703193-38a8-4b79-b9e6-395654ab6d15মানবাধিকার বিষয়ক সাব কমিটির সদস্য জোসেফ ওয়াইডেনহোলজার বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি ও মানবাধিকার বিষয়ক সাবকমিটির সদস্য আমজাদ বশির বলেন, দেশটির নেতৃত্বস্থানীয় দলগুলোকে সত্যিকারের নেতৃত্ব দেখাতে হবে যাতে করে দেশটিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা যায়। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের উত্তরনের একমাত্র উপায়।


আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে তিনি এও বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে নাক গলানোর জন্য দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়ী করেন। দলগুলো অনেক সময় বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে নালিশ করে থাকে। যার ফলে তারাও এতে আরও উৎসাহিত হয়ে দেশের নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকে।


বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু, জঙ্গিবাদ ও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এখন বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দেন-দরবার করছেন প্রকাশ্যে। আগে কূটনীতিকরা দূতিয়ালি করতো আড়ালে-অবডালে। এখন মোটামুটি প্রকাশ্যেই তারা এদেশের রাজনীতিকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।


বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দল সংকট নিয়ে ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের কাছে নিজেদের দাবি ও অবস্থান তুলে ধরেন। আবার তারা অনেক সময় নির্লজ্জের মতো বিদেশীদের কাছে নালিশ করে থাকেন। এতে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার দুঃসাহস দেখান।


বাংলাদেশের যে কোনো ইস্যুতে কূটনীতিকরা আগ বাড়িয়ে তারা অযাচিত মন্তব্য করে, যা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, কূটনীতিকরা তাদের সীমা লংঘন করে আমাদের জাতীয় বিষয়ে মন্তব্য করছেন, যা অনভিপ্রেত। তিনি আরো বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদদের পরমুখাপেক্ষিতা এবং বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে ধরনা দেওয়ার কারণে বাংলাদেশে কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জাতীয় বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ কূটনৈতিক শিষ্টারচার বহির্ভূত। তিনি বলেন, বিদেশিদের কাছ থেকে আমরা সাহায্য পাই বলেই তারা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন।


বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি কূটনীতিক অতি মাত্রায় বাংলাদেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। তাই তারা সরকারকে এ বিষয়ে আরও সতর্ক ও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে কূটনীতিকদের অবাঞ্চিত ঘোষণা করতে বলেন ওই বিশেষজ্ঞরা।


বাংলাদেশ২৪অনলাইন/টিএম



মন্তব্য