ঢাকা - এপ্রিল ২৩, ২০১৮ : ৯ বৈশাখ, ১৪২৫

প্রিয় মেয়রের জন্য কাঁদছে নগরবাসী

নিউজ ডেস্ক
ডিসেম্বর ০৩, ২০১৭ ১৭:৫৫

সবাইকে কাঁদিয়ে অবশেষে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের(ডিএনসিসি) প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বনানী কবরস্থানে শায়িত হয়েছেন। শনিবার বিকেল সোয়া ৫টায় ছোট ছেলে শারাফুল হকের কবরে দাফন সম্পন্ন হয় আনিসুল হকের। এর আগে বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটে বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে মরহুমের জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।

এই 'স্বপ্নের সারথি' মানুষটি মাত্র দুই বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নগরের রূপ বদলে দিতে পেরেছিলেন অনেকটা। তার জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ আর স্বপ্নের মধ্য দিয়েই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন নগরবাসীর মাঝে। আনিসুল হকের মৃত্যুয়তে ব্যথিত সবাই।

মেয়র আনিসুল হককে স্মরণ করে দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, ‘আমি একা হয়ে গেছি। দু’জন মিলে আধুনিক ঢাকা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। এখন জানি না ভবিষ্যতে সে স্বপ্নের কী হবে?’ তিনি বলেন, ‘বড় ভাই হিসেবে আনিসুল হক সবসময় আমার পাশে ছিলেন। এখন আমার কাছে সবকিছু অন্ধকার মনে হচ্ছে।

আনিসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আনিসুল হকের মতো আরেকজন খুঁজে পাওয়া কঠিন। তারপরও এটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। তাঁর স্বপ্ন যেন সত্যি হয়, এ নগরীকে আধুনিক নগরীতে রূপ দিতে গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটির স্বপ্নকে বৃথা যেতে দেব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাঁর দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল, স্বপ্ন ছিল ঢাকাকে আধুনিক সিটি হিসেবে গড়ে তোলার। দেশের অনেক বড় ক্ষতি হলো। ব্যক্তিগতভাবে আমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলাম।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আনিসুল হক সবাইকে কান্নার নদীতে ভাসিয়ে চলে গেলেন। এ শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এমন কর্মোদ্যমী, এমন পরিশ্রমী বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষ আমি জীবনে কমই দেখেছি।’ তিনি বলেন, ‘মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন। মানুষও তাঁকে যে ভালোবাসে, তার প্রমাণ এই যে তাঁর বাসার সামনে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি। একজন মানুষ কত জনপ্রিয় হলে মানুষের ভিড় এমনভাবে উপচে পড়ে, আজকে আমরা তা দেখলাম।’

নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, আনিসুল হক রাজনীতির লোক ছিলেন না। কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে কুশলতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রয়োজন, তা তিনি অর্জন করছিলেন দ্রুততার সঙ্গে। শহরের বাস্তুপরিবেশ কীভাবে উন্নত করা যায়, সে ব্যাপারেও তিনি সচেতন ছিলেন। মাত্র আড়াই বছরে ঢাকার মতো একটা সমস্যাসংকুল শহরের জন্য তিনি যতটুকু করতে পেরেছেন, সেটা একটা উদাহরণ।

মেয়র আনিসুক হকের মৃত্যুতে সাধারণ মানুষও শোকাগ্রস্ত। নগরবাসী নিজেদের হাহাকার আর কষ্টের কথা জানিয়ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে।

মোস্তফা নামে একজন লিখেছেন, চলে গেলেন আনিসুল হক। গত একমাস কক্সবাজার থেকে ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ পর্যটন নগরী দেখে একটা জিনিস ভাবছি, আর সেটা হলো কক্সবাজার এর জন্য একজন আনিসুল হকের মতো মেয়র দরকার ছিলো। বাসযোগ্য ঢাকার স্বপ্ন কারিগর আর নেই। ঢাকার জন্য উনি অনেক কিছুই করেছেন ও করতেন। ভালো থাকুন ওপারে প্রিয় মেয়র।

সাংবাদিক আনিস আলমগীর লিখেছেন, আমরা ঢাকার বাসিন্দারা এমন একজনকে হারালাম, যার বিকল্প দেখি না। অল্প কদিনেই তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় যে ক’টি দৃশ্যনীয় পরিবর্তন এনেছেন, তাতে প্রমাণ করেছেন- ইচ্ছা থাকলে নগরবাসীকে নগরকর্তারা অনেক স্বস্তি দিতে পারেন। সব কিছু তিনি করতে পারেননি, কিন্তু তার ইচ্ছাটা প্রকাশিত হয়েছে প্রতি পদক্ষেপে।

শেখ সালাম নামে একজন লিখেছেন, ঢাকা মহানগরীর জন্য মেয়র আনিসুল হকের মহৎ উদ্যোগ আর কাজের জন্য ঢাকাবাসী মনে রাখবে আরো অনেক দিন। তার আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।

দেওয়ান আবদুল খালেক লিখেছেন, চলেই গেলেন স্বপ্নবাজ আনিসুল হক। তিনি মেয়র হওয়ার পর মানুষকে শুধু স্বপ্নই দেখাননি, অনেক স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেছেন। যার সুফল ঢাকার উত্তরের বাসিন্দারা পাচ্ছেন। তাই তার এভাবে চলে যাওয়াটা, মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। তার মতো স্বপ্নবাজরা এভাবে চলে গেলে, সাধারণ মানুষের যে ক্ষতি হয়, তা অপূরণীয়।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা। এরপর তাঁকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেওয়া হয়। তবে মঙ্গলবার রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁকে আবার আইসিইউতে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০.২৩ মিনিটে মেয়রকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেয়রের মরদেহ বহনকারী বিমানটি সিলেটে এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। এরপর বেলা ১টার দিকে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায় ফ্লাইটটি। পরে সেখান থেকে বেলা ১টা ২০ মিনিটের দিকে মরদেহ বনানীতে তার নিজ বাসায় নেয়া হয়। এ সময় সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীসহ মেয়রের ছোট ভাই সেনাপ্রধান আবু বেলাল মো. শফিউল হকও বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।

এরপর বিকেল ৩টায় বনানীর বাসা থেকে বের হয়ে আনিসুল হকের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি বিকেল সাড়ে ৩টায় আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর বিকেল সোয়া ৪টায় আর্মি স্টেডিয়ামে জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর তাঁকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে গত শুক্রবার বাদ জুমা আনিসুল হকের প্রথম নামাজে জানাজা লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক সেন্ট্রাল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।



মন্তব্য